মেটিয়াবুরজের বাদশা
‘আখতার’ এ-জার ভী হো
মুসহফ-এ-রুখ পর শৈদা।
ফাল য়ে নেক হৈ কুরআন সে হম
দেখতে হৈঁ।।
চিরকুমার নায়ের কদর মেটিয়াবুরজের সিবতায়নাবাদে
মহরমের মাতমের আয়োজন করছিলেন। ‘সিবতায়নাবাদ’-এর
অন্তর্গত ‘সিবতায়ন’ শব্দ দ্বারা ইমাম হাসান
ও হোসেনকে বোঝানো হয়। অতএব, মেটিয়াবুরজের ‘সিবতায়নাবাদইমামবাড়া’ হল দ্বিতীয় ইমাম হাসান এবং তৃতীয় ইমাম হোসেনের স্মরণে নির্মিত ইমারত। হাসান-হোসেন দু জনেই ছিলেন হজরত মহম্মদের দৌহিত্র। হাসানকে বিষপ্রয়োগ করে
হত্যা করা হয় এবং হোসেনকে হত্যা করা হয় কারবালার যুদ্ধে। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য
বিশ্বের নানা দেশে তৈরি হয়েছে ইমামবাড়া। তেমনই এক সিবতায়নাবাদ ইমামবাড়ায় ওয়াজেদ
আলি শাহ-র প্রপৌত্র মহরমের শোকগাথার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে এলু জানের প্রপৌত্রী
নীলু জান বিনীতভাবে উপস্থিত হলেন। ইমামবাড়ার মৌলবিরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নীলু,
তুমি এখন কোথা থেকে আসছ, এতকাল কোথায় ছিলে?’’ নীলু জান উত্তর দিলেন,
নাজিরগঞ্জ-বিচালিঘাটে খেয়া পারাপার করে যে বারো জন মাঝি, আমি এত দিন তাদের কিসসার
আসরে ছিলাম, সেখানে ওয়াজেদ আলি শাহরচিত বিচিত্র আখতারনামা আর ইশকনামা সিরকাওয়ালির
মুখে শুনেছি। তার পর বহু ইমামবাড়া, মন্দির-মসজিদ ভ্রমণ করে অবধ দেশে যাই, যেখানে
অর্থকামের মহাযুদ্ধ হয়েছিল। এখন আপনাদের দর্শন করতে এসেছি। হে ইমানদারগণ, আপনারা
মর্সিয়া গেয়ে অশ্রুপাত করে শুচি হয়ে দুঃখে বসে রয়েছেন, আমার কাছে কী শুনতে ইচ্ছা
করেন আদেশ করুন—পবিত্র কুরআনকথা, না নবি ও ইমামদের ইতিহাস? মৌলবিরা বললেন, বারো জন
মাঝির কিসসার আসরে সিরকাওয়ালি যে ওয়াজেদ আলিরচিত আখতারনামা আর
ইশকনামা বলেছিলেন আমরা তাই শুনতে ইচ্ছা করি।
নীলু জান বললেন, চরাচরগুরু হজরত
মহম্মদকে সালাম জানিয়ে এবং হজরত আলি, ইমাম হাসান-হোসেন থেকে ইমাম মেহেদি পর্যন্ত
বারো জন ইমামকে কলিজায় রেখে আখতারনামা আরম্ভ করছি। কয়েকজন মাঝি এই ইতিহাস পূর্বে
বলে গেছেন, এখন অপর মাঝিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য মাঝিরাও বলবেন। ওয়াজেদ আলি
শাহ আখতারনামা সংক্ষেপে বলেছেন আবার সবিস্তারেও বলেছেন। কোনও কোনও মাঝি এই গ্রন্থ
আদি থেকে, কেউ সাদত আলি খানের আখ্যান থেকে, কেউ বা আমজাদ আলি শাহ-র উপাখ্যান থেকে
পাঠ করেন।
ইশকনামা, মসনভি, শের, গজল রচনার পর
ওয়াজেদ আলি শাহ ভেবেছিলেন কোন উপায়ে কলকাতার মানুষদের এই ইতিহাস অধ্যয়ন করাব? তখন
এক দরবেশ তাঁর কাছে আবির্ভূত হয়ে বললেন, তুমি নৌকার মাঝিদের স্মরণ কর, তাঁরাই
তোমার গ্রন্থের প্রচারক হবেন। জলভাগের বেতাজ বাদশা চিরজীবী খাজা খিজির
জোয়ার-ভাঁটায় নৌকা চলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যাত্রীদের শোনাবেন তোমার কথন, স্রোতের
সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়বে দূর দূরান্তে। ওয়াজেদ মাঝিদের ডেকে পাঠালে তাঁরা বললেন, আমরা
সম্মত আছি, কিন্তু আমাদের শ্রবণ ক্ষণমাত্র থামবে না। ওয়াজেদ ভাবলেন আমার এক হাজার
এক শো এমন পরি আছে যাদের উড্ডয়নক্ষমতা কেবল আমি আর আমার পুত্র ফরিদ-উদ-দিন কদর
বুঝতে পারি, অন্য পুত্র কমর কদর পারেন কিনা সন্দেহ। ওয়াজেদ মাঝিদের বললেন, আমি বলে
যাব আপনারা তার অর্থ না বুঝে কর্ণে প্রবেশ করাতে পারবেন না। মাঝিরা বললেন, তাই
হবে। মাঝিদের শ্রবণক্ষমতা প্রখর হলে কী হবে, পরিদের কথা উঠলেই তাঁদের উথালপাথাল
ভাবতে হত। দরিয়ার মাঝিরা নানা দেশের বিচিত্র পরিদের আকাশগামিতার কথা ভেবে
কূলকিনারা পেতেন না, সেই অবসরে ওয়াজেদ আলি অন্য বহু মসনভি রচনা করতেন।
নীলু জান বললেন, অবধের সমস্ত নবাব
ও রাজাদের পতাকা মৎস্যলাঞ্ছিত। কেন, সেই কাহিনি প্রথমে শোনাই।
এক বার নমরুদ বাদশা খোদার সঙ্গে
যুদ্ধ করবে বলে ঠিক করল। এমন সময় সেখানে ইবরাহিম এলেন। নমরুদের সৈন্যরা তাঁকে
আগুনে ফেলে দিল। আগুনের মধ্য থেকে তিনি বললেন, হে নমরুদ! আমার কী অপরাধ? নমরুদ
কোনও উত্তর দিল না। ইবরাহিম বললেন, আমি কোনও অপরাধ করিনি তথাপি আগুনে প্রক্ষিপ্ত
হয়েছি, তোমার বিচার খোদা করবেন।
নমরুদ তার সৈন্যদের বলল, আমার তীরধনুক নিয়ে এসো। আমি
ইবরাহিমের খোদার সঙ্গে যুদ্ধ করব। আসমানের দিকে একটার পর একটা বাণ মারে কিন্তু
খোদার গায়ে লাগে না। খোদা মুচকি হেসে বললেন, বেচারা নমরুদ এত কষ্ট করে আমাকে হত্যা
করার চেষ্টা করছে, এক কাজ করা যাক! ওর একটা বাণে রক্ত লাগিয়ে ফেরত পাঠানো যাক।
কিন্তু খোদার রাজ্যে রক্ত কে দেবে? সব প্রাণী চুপ। মাছ এগিয়ে খোদাকে বলল, প্রভু!
আমার রক্ত নিন। খোদা মাছের রক্তে রাঙিয়ে নমরুদের বাণ ফেরত পাঠালেন। নমরুদ খুশিতে
ডগমগ করতে লাগল, তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে সে মেরে ফেলেছে। ও দিকে মাছের
সম্মান বাড়ল। খোদা বললেন, আজ থেকে সব প্রাণীর রক্ত হারাম, শুধু মাছের রক্ত হালাল।
সে হল অশুভ-র বিরুদ্ধে শুভ। সেই জন্য রাজ দরবার থেকে শুরু করে সর্বত্র এই মাছের
ছবি। ইসলামে এমনিতে জন্তুজানোয়ারের তসবির নিষিদ্ধ। কিন্তু মাছ হল শুভ, তাই তার ছবি
লখনউ আর মেটিয়াবুরজের দেওয়ালে দেওয়ালে।
চিরকুমার নায়ের কদর বললেন, কিন্তু আমি
পিতা মেহের কদরের কাছে খাজা খিজিরের কথা শুনেছিলাম, মেহের কদর শুনেছিলেন তাঁর
আব্বা ব্রিজিস কদরের কাছে, ব্রিজিস সম্ভবত তাঁর পিতা ওয়াজেদ আলি শাহ বা মাতা হজরত
মহলের কাছে শুনে থাকবেন। এই মাছ হল খাজা খিজিরের প্রতীক। ইসলামি পুরাণে আছে,
হজরত খিজির পাতালপুরী তথা জলভাগের বেতাজ বাদশা। তিনি চিরজীবী, রোজ কেয়ামত পর্যন্ত
তাঁর মরণ নেই। আবে হায়াত বা অমরত্বের কূপের জল খেয়ে ইনি সেই বর লাভ করেছেন। জল
রাজ্যে তাঁর নির্দেশ ও বিধি-বিধানসমূহ মান্য করা হয়। জলচর জীবকূল তাঁর দ্বারা
পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। তা ছাড়া, এই মাছ ছিল ইসলাম-পূর্ব যুগের পারস্য রাজা
পারভেজের পতাকার চিহ্ন। বাদশার কাছে, এ হল শুভ প্রতীক। তাই অবধের পতাকায়, এমনকি
ইমামবাড়াতেও সেই মাছের ছবি।
নীলু জান
বলেন, পারস্য রাজা পারভেজের এক বংশধর ছিলেন মীর মহম্মদ নাসির। ওয়াজেদ আলি শাহ-র
সপ্তম উর্ধ্বতন পুরুষ নাসিরের নিবাস ছিল খোরাসানের নিশাপুরে। সেই আমলে নিশাপুর ছিল একটি অতি মনোরম স্থান। রাজঐশ্বর্যের কোনও কিছু নাসিরের
ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু তিনি আব্বাজান ও দাদোজানের কাছে পূর্বপুরুষের নানা কিসসা
শুনে ভাবতেন কী ভাবে রাজা হওয়া যায়! নিশাপুরের মসজিদে পাঁচ বার নমাজের পর তিনি
খোদাতালার কাছে মোনাজাত করতেন, তাঁকে না হোক, অন্তত তাঁর উত্তরপুরুষকে যেন সেই হৃত
সম্মান ফেরত দেওয়া হয়! এক দিন মগরেব নমাজের শেষে মসজিদ ছেড়ে সকলে চলে গেলে তিনি
আল্লার দরবারে মোনাজাতের হাত তুলেই থাকেন। কুপির আলোয় ভাল করে ঠাহর করা যায় না,
তবু তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তাঁর চোখের সামনে সাদা পিরহান পরা এক হাত
দাড়িবিশিষ্ট এক দরবেশ দাঁড়িয়ে। তিনি “হক্কে লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ বলে তাঁর মুখের দিকেই
তাকাতেই দেখেন, দরবেশের সুরত যেন বাদরিয়ার মতো। রবিউল আওয়াল হল হিজরি চান্দ্র
বছরের প্রথম বসন্ত, সেই মাসের ১৫ তারিখে আকাশে থালার মতো যে চাঁদ দেখা যায়, তা যেন
দরবেশের মুখে বসানো। নাসির দরবেশকে আদাব জানালে তিনি ডাইনে সালাম ফিরে বামে সালাম
ফেরার ফুসরত পেলেন না। সেই দরবেশ নাসিরকে বলে উঠলেন, “অনেক পেরেশানি হচ্ছে বেটা,
তু হিন্দুস্থানে চলে যা। ওখানে পটনা বলে এক খুবসুরত জায়গা আছে। সেখানে চলে যা।
ওখানে গেলে তোর তকদির খুলবে। যদি দেখিস, খুলছে না, তখন ভেবে নিস, তোর না খুললে তোর
বেটার খুলবে, তার না খুললে তার বেটার খুলবে। কিন্তু জরুর
খুলবে।’’ এই কথা বলে দরবেশ মসজিদ থেকে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে এসে
মুহাম্মদ নাসির তাঁর জৈষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদ বাকারকে সব কথা খুলে বললেন। বাকার ছিল
কিঞ্চিৎ বোকাসোকা সরল ভাল মানুষ। সে দরবেশকে মনে মনে সালাম জানিয়ে পিতার সঙ্গে
হিন্দুস্থানে বাণিজ্য করার ইচ্ছে প্রকাশ করল। স্ত্রী ও কনিষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদ আমিন
নিশাপুরে থাকবেন। আর পাঁচ জন ভাগ্যান্বেষীদের স্ত্রীপুত্র যেমন ভাবে থাকেন।
হিন্দুস্থানের
নাম শোনেনি, এমন লোক খোরাসানে মেলা ভার। কিন্তু সেই দেশ কীভাবে যাওয়া যায়, তা সকলে
জানে না। যারা জানে তারা বলল, হিন্দুস্থানযাওয়া বেশ ঝকমারি ব্যাপার। এলাকার
বণিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নেহবান্দান, কুচলক, জামপুর, ঘারসানা, হাশরাস,
কনৌজ, লখনউ হয়ে পটনা গেলে প্রায় দু হাজার মাইল রাস্তা। পুরোটা রাস্তা ঘোড়ায় চেপে
গেলে বিস্তর খরচ। তবে কিছুটা পদব্রজে এবং কিছুটা ঘোড়ায় গেলে তার থেকে কম খরচে হবে।
কিন্তু তার খরচও নেহাত কম নয়। নাসির মিঞার জমানো কিছু স্বর্ণমুদ্রা আছে। কাউকে
কিছু না বলে তিনি সেই অর্থ আর পুত্র বাকারকে নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে রওনা দিলেন। পথের
কথা যত না বলা যায় তত মঙ্গল। এই রাস্তায় খরচ বাঁচাতে গিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে
মুহাম্মদ নাসিরের শরীর গেল ভেঙ্গে। সেই ভাঙা শরীর নিয়ে তিনি যখন পৌঁছলেন পটনা, তখন
মনে হল, এই ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে কীভাবে কাজ করবেন! তার পর শুনলেন,
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। তিনি খুব কড়া ধাতের শাসক। তবে
একটাই ভরসা, মুর্শিদকুলি খাঁ নাকি জাতিতে পারসিক। মুহাম্মদ নাসিরও এসেছেন পারস্য
থেকে। দেশের লোক বলে তাঁকে একটু খাতির করতে পারেন।নবাবের কাছে আরজি জানালে কোনও
কাজ পাওয়া যেতে পারে। নাসির মুর্শিদকুলির কাছে যাওয়ার তত্ত্বতালাশ শুরু করলেন।
হাজি
ইসপাহানি নামের এক পারসিক অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন মুঘলদের রাজকর্মচারী, তিনি
মুর্শিদকুলিকে ক্রীতদাস হিসাবে ক্রয় করেন। সেই সময় মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের ধনবান
ব্যক্তিরা ক্রীতদাস খরিদ করতেন।হাজি ইসপাহানি ধনাঢ্য আবার বিবেচক মানুষ। তিনি
বুদ্ধিমান মুর্শিদকুলিকে ধীরে ধীরে শিক্ষিত করে তোলেন। ইসপাহানির সঙ্গে তিনি এলেন
ভারতবর্ষে। তাঁকে ভারতে আনা হলে মুর্শিদকুলি অগ্নির উপাসক থেকে ধর্মান্তরিত হন,
তাঁর নতুন নাম হয় করতলব খান। তবে পটনার হিন্দুরা অন্য কথা বলে। মুর্শিদকুলি নাকি উড়িষ্যার বামুন। হাজি ইসপাহানি তাঁকে ক্রীতদাস হিসাবে কিনে
নিয়ে ধর্মান্তরিত করেন এবং তাঁর নতুন নাম দেওয়া হয় মির্জা হাদি।
মুহাম্মদ
নাসিরের সৌভাগ্য হল মুর্শিদকুলি খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। চেহারা ও স্বাস্থ্য
দেখে তাঁকে উড়িষ্যার ব্রাহ্মণের তুলনায় পারসিক বলেই মনে হল নাসিরের। নবাব মুহাম্মদ
নাসিরের ভগ্ন স্বাস্থ্য দেখে তাঁকে লেখাজোখা আর হিসাবপত্রের কাজে বহাল করলেন।
নাসির মিঞার মনে বড় দুঃখ হল। তিনি ভেবেছিলেন, সেনাবাহিনীতে কোনও কাজ পাবেন। কিন্তু
হিসেবনিকেশ! সে বড় অপছন্দের কাজ!জৈষ্ঠ্য পুত্র বাকারই যোগবিয়োগের সব কাজ সামলায়। নাসির মিঞা নবাবের দেওয়া ঘরে সারা দিন অলসভাবে শুয়েবসে কাটান আর ভাবেন ফেলে
আসা নিশাপুরের জীবন।
পিতা ও
ভ্রাতা চলে যাওয়ার পর মুহাম্মদ আমিন খুব নিঃসঙ্গ বোধ করছিলেন। একটি সংসারের অর্ধেক
লোক হঠাৎ করে কোথাও চলে গেলে বেশ ফাঁকাফাঁকা লাগে। তার উপর পিতা আর অগ্রজ না থাকলে
সংসারে থাকা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে।নিঃসঙ্গতার প্রায় এক বছর কেটে গিয়েছে। হঠাৎ একদিন
রাতে ঘুমের মধ্যে আম্মাজান ইন্তেকাল করলেন। আমিনের মাথায় যেন বাজ পড়ল। এই ধরাধামে
তিনি একা বেঁচে থেকে কী করবেন! পিতা ও অগ্রজ আর দেশে ফিরে আসবেনকিনা তাও তিনি
জানেন না! এমন সব কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর কয়েক দিন কাটলো। এর মধ্যেই আচমকা তাঁর
সঙ্গে দেখা হল সেই দরবেশের, যিনি পিতাকে হিন্দুস্থানে যেতে বলেছিলেন। দরবেশকে তাঁর
ভারি অপছন্দ হল!
দিনের আলোয়
সেই বিবর্ণ দরবেশকে দেখে গরিব-মিসকিন বলেই বোধ হয়। এই দরবেশের মুখে পিতা পূর্ণিমার
চন্দ্র দর্শন করেছিলেন ভেবে আমিনের একটু আশ্চর্য লাগে। দরবেশ তাঁকে বললেন, “হে
পুত্র! তুমি এখানে আছো কেন? জলদি হিন্দুস্থানে যাও! তোমার আব্বাজান পেরেশানিতে
আছেন। তুমি না গেলে তকদির খুলবে না এই রাজবংশের!’’
তকদির নয়,
পিতার স্বাস্থ্যচিন্তায় বিভোর হয়ে উঠলেন মুহাম্মদ আমিন। মায়ের ইন্তেকালের পর তাঁর
কিছু গয়নাগাটি আমিনের সম্বল ছিল। তিনি সেই সব পুঁজি করে বেরিয়ে পড়লেন
হিন্দুস্থানের দিকে। তাঁকে যেতে হবে পটনায়। অতটা পথ একা যাওয়া তাঁর মতো অল্পবয়সীর
পক্ষে বেশ অসম্ভব। বরাতজোরে তিনি সঙ্গ পেয়ে গেলেন একদল আরব বণিকের যারা পারস্যের
মধ্য দিয়ে হিন্দুস্থানে যাচ্ছিল বাণিজ্য করতে। আমিন তাঁদের সব কথা খুলে বললেন। বণিক দলটির সর্দারের মায়া হল।তিনিওয়াদা করলেন
যে আমিনকে লখনউ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। তার পর তাঁকে একাই যেতে হবে পটনা। খুঁজে বের করতে হবে পিতা ও অগ্রজকে।
আমিন পটনা
এলেন। দাদা বাকারকে খুঁজে পেলেন সহজেই। কিন্তু মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। কয়েক দিন
আগে আব্বাজান ইন্তেকাল করেছেন, তাঁর দাফন হয়েছে পটনার এক কবরস্থানে। বাকার আমিনের
মুখে শুনলেন মায়ের মৃত্যুর কথা। এতিম বাকার ও আমিন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে
লাগলেন। তার পর ছাড়িয়ে নিলেন নিজেদের। বাকার মির-মুনশির কাজ নিয়ে থেকে গেলেন পটনায়।
আমিন বেরিয়ে পড়লেন ভাগ্যের খোঁজে। নবাবের আদেশ নিয়ে বাকার গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ
করলেন। তাঁর একটি পুত্র হল, নাম মুহাম্মদ মকিম।
ভাগ্যের
সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে দিল্লি পৌঁছলেন মুহাম্মদ আমিন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সৌহার্দ
হল কারা মাণিকপুরের ফৌজদার সরবুলন্দ খানের। কারা মাণিকপুর ইলাহাবাদের অংশ।
সরবুলন্দ রূপবান আমিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, বৎস আমিন, আমি তোমার কী প্রিয়সাধন করব
বল। তুমি ধর্মানুসারে আমার সেবা করেছ, আমাদের পরস্পরের প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তোমার সকল কামনা পূর্ণ হবে।
আমিন বললেন,
মালিক! আমি একখানা চাকরি চাই। এবং সেই চাকরি যেন হয় সম্মানের, ক্ষমতার আর উপরে
ওঠার মইস্বরূপ।
সরবুলন্দ খান
দেখলেন মুহাম্মদ আমিনের শরীর পাখতুনদের মতো পেটানো। তাছাড়া তাঁর বুদ্ধিশুদ্ধিও বেশ
তীক্ষ্ণ। তিনি আমিনকে তাঁর অধীনে ফৌজি সর্দার করে নিলেন। তবে আমিন দিল্লিতে থাকতে
পারবেন না। তাঁকে সরবুলন্দের সঙ্গেই যেতে হল ইলাহাবাদের কারা মাণিকপুরে। নতুন
চাকরি, অর্থ ও ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে ভালই কাটছিল মাণিকপুরের জীবন। ইতিমধ্যে তাঁর
শাদি হল। সরবুলন্দই সে সবের ব্যবস্থা করলেন। শ্বশুর মশাইও ক্ষমতাবান মানুষ। কিন্তু
শাদির পরে তাঁর জীবনে ঘনিয়ে এল বিপর্যয়। প্রথমে ফৌজের মধ্যেই নানা রকমের ঝামেলা আর
সে সবের জেরে বাধল সরবুলন্দের সঙ্গে বিবাদ। শেষ পর্যন্ত চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি
সস্ত্রীক চলে গেলেন দিল্লি। সেখানে গিয়ে শ্বশুরের প্রভাব খাটিয়ে মুঘল সম্রাট ফারুখসিয়রের
সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। হলেন সুবেদার।
ফারুখসিয়র
তাঁর আপন চাচা জাহান্দার শাহকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছেন। জাহান্দার শাহ নাকি অতি
বিলাসী আর রমণীপ্রিয় সম্রাট ছিলেন। তাঁর আতরের গন্ধ পাওয়া যেত পাঁচ ক্রোশ দূর
থেকে। প্রাসাদে সব সময় বসত নাচের আসর। সামান্য নর্তকী লাল কানোয়ারকে জাহান্দার শাহ
দিয়েছিলেন প্রধান মহিষীর আসন। জাহান্দারের পিতামহ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল
সাম্রাজ্যের অবস্থা বেশ খারাপ। জাহান্দারের পিতা প্রথম বাহাদুর শাহ অর্থাৎ
ঔরঙ্গজেবের পুত্র মাত্র এক বছর সিংহাসনে ছিলেন, জাহান্দার শাহও তাই। বিলাস আর
প্রমোদের চক্করে তিনি ঘরেই বানিয়ে তুলেছিলেন শত্রু। ভাইপোর হাতে খুন হলেন
সম্রাট।শুরু হল অরাজকতা। মুহাম্মদ আমিন বুঝলেন, এই ডামাডোলের বাজারে দক্ষ সেনানায়ক
হতে পারলে লাভ। কখন ভাগ্যের চাকা কী ভাবে খুলে যায়, কেউ বলতে পারে না!
শুরুটা ভালই
হল ওয়াজেদ আলি শাহ-র উর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ মুহাম্মদ আমিনের। শ্বশুরের কৃপায় তিনি
মুঘল সম্রাট ফারুখসিয়রের কাছ থেকে নতুন উপাধি পেলেন “হিফৎ-এ-হাজারি”। সৈন্যবাহিনীতে তাঁর খুব প্রতিপত্তি। কিন্তু এর মধ্যে আবার বিপত্তি বাধল। সৈয়দ
ভাইদের বিদ্রোহে টলোমলো হল ফারুখসিয়রের গদি। যে আসফ জাহ, সরবুলন্দ
খান ছিলেন সম্রাটের কাছের মানুষ, সেই সেনাপতিরাও বিশ্বাসঘাতকতা করল। ফারুখসিয়র
বন্দি হলেন। তাঁকে শুধু কয়েদ করা হল না, শুরু
হল শারীরিক অত্যাচার। শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হল তাঁকে। চোখে সুঁচ ফুটিয়ে অন্ধ করে
দেওয়া হল, খেতে দেওয়া হল না। অত্যাচার সহ্য করতে না প্রে, সৈয়দ ভাদের অভিশাপ দিতে
দিতে মারা গেলেন সম্রাট। ফারুখসিয়রের চাচাতো ভাই রফি-উদ-দরাজাতকে সিংহাসনে বসাল
সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়। কিন্তু মুঘল সন্তানদের এ বড় ডামাডোলের বাজার, সকলেই সম্রাট হতে
চান। সিংহাসনে বসার তিন মাসের মধ্যে ইন্তেকাল হল রফি-উদ-দরাজাতের। কে গোপনে বিষ
প্রয়োগ করেছিল তা জানা না গেলেও বিখ্যাত সুফি সাধক কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর পাশে
তাঁকে কবর দিয়ে এলেন তাঁরই দাদা রফি-উদ-দৌল্লা। তার পর নতুন নাম “শাহজাহান” নিয়ে ভিড়লেন কুচক্রী সৈয়দ ভাইদের পদতলে। দ্বিতীয়
শাওজাহানকে সিংহাসনে চড়ালেন কুখ্যাত দুই সৈয়দ ভাই—হাসান আর হোসেন। রফি-উদ-দৌল্লা
ওরফে দ্বিতীয় শাহজাহানের রাজত্বের মেয়াদ মাত্র চার মাস। নিজেদের স্বার্থে ঘা পড়লে
এক মুহূর্ত কাউকে বরদাস্ত করতে নারাজ হাসান আর হোসেন। এ বার সিংহাসনে বসলেন
বাহাদুর শাহ-র চতুর্থ পুত্র খুজিস্তা আখতারের ছেলে সম্রাট মহম্মদ শাহ। সৈয়দ ভাইরাই
তাঁকে ক্ষমতায় আনলেন।
মহম্মদ শাহ মসনদের
দখল পাওয়ার পর ভাগ্য খুলে গেল মুহাম্মদ আমিনের। তিনি পেলেন অনেক ক্ষমতা। এক ডাকে
তাঁকে সবাই চেনে। ও দিকে বিশ্বাসঘাতক আসফ জাহ সম্রাটের অনুগত হয়ে উঠল। মহম্মদ আমিনওসম্রাটের
দরবারে যাতায়াত বাড়িয়ে দিলেন। আমিন
সম্রাটকে বোঝালেন যে যে করেই হোক এই সৈয়দ ভাইদে হাত থেকে মুক্তি পেতে হবে। নইলে
সিংহাসন থাকবে না। তাতে যদি ছল আর বল প্রয়োগ করতে হয়, তাও করতে হবে। সৈয়দ হাসান ও
হোসেনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার নানা কৌশল গোপনে ঠিক হতে লাগল। আমিন সম্রাটকে বোঝালেন,
যে করেই হোক এই দুই ভাইকে কোতল করতে হবে, তবেই মিলবে তাদের হাত থেকে মুক্তি, নইলে শুধু
সিংহাসন কেন, ধনপ্রাণ সব চলে যাবে রসাতলে!
এর ঠিক এক
বছরের মাথায় ফতেপুরে নির্মমভাবে খুন হল হোসেন। কে তাকে খুন করল তা কেউ জানে না।
তার লাশের দাফন হল। তার ঠিক দু বছর পর সিকরিতে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হল
হাসানকে। ভাইয়ের পাশে তার জন্য কবর প্রস্তুত ছিল। তাকেও গোরস্থ করা হল। সৈয়দ
ভাইদের হাত থেকে চিরতরে মুক্তি। আমিনের সঙ্গে সম্রাটের দোস্তি উঠল জমে।
এক দিন কথা
প্রসঙ্গে মুহাম্মদ আমিন সম্রাটকে বলেই ফেললেন গল্পটা। তিনি শিয়াদের সপ্তম ইমাম
মুসা ইবনে জাফরের বংশধর। তাঁর পিতামহ ছিলেন বিখ্যাত বণিক। মুঘলদের সঙ্গে তাঁর ছিল
অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। তা ছাড়া, ইসলাম-পূর্ব যুগের পারস্য রাজা পারভেজও তাঁর
পূর্বপুরুষ। এ সব কথা না বললে, সম্রাটের সমান আসনে বসা যায় না। তাঁর বংশগৌরব তো
নেহাত তুচ্ছ নয়। আর এ সব কথা তিনি বানিয়েও বলছেন না!
মহম্মদ শাহ
মুহাম্মদ আমিনকে নতুন উপাধি দিলেন “সাদাত খান বাহাদুর”। তাঁকে আগ্রার শাসক করা হল।
এই সেই আগ্রা যেখানে আশ্চর্য ইমারত তাজমহল বিরাজ করে। সকালে-বিকেলে নিয়ম করে তিনি
তাজমহলের শোভা দেখেন। কখনও কখনও মসজিদে নমাজ পড়েন আর মেহমানখানায় অতিথিদের খোঁজখবর
করেন। যমুনা নদীর তীরে ভালই দিন কাটতে লাগল মুহাম্মদ আমিন ওরফে সাদাত খান
বাহাদুরের।
সম্রাট
মহম্মদ শাহ ছিলেন উচ্চ রুচির মানুষ। তিনি “সদা রঙ্গীলা” ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন।
আড়ালে লোকে তাঁকে ‘মহম্মদ শাহ রঙ্গিলা’ নামে ডাকত। মুহাম্মদ আমিন ওরফে সাদাত খান
বাহাদুরের ছিল কাব্যপ্রতিভা। তিনি ফারসি ভাষায় বেশ কিছু মসনভি রচনা করেছেন। এই
কাব্যচর্চার সুবাদে তাঁর মাঝেমধ্যে ডাক পড়ে দিল্লির দরবারে। সম্রাট নিজে তাঁর
সঙ্গে বসে কবিতা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। এই সব কাব্যচর্চার মাঝে হঠাৎ তাঁকে অবধের
নবাব বানিয়ে দিলেন সম্রাট। আগ্রার শাসক হওয়ার ঠিক দু বছর পর। এ ছাড়া তিনি
গোরখপুরের সৈন্যবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পেলেন। এত প্রতিপত্তি আর সম্মান নিয়ে
তিনি কী করবেন! মুহাম্মদ আমিনের মনে যে শান্তি নেই। একটি মাত্র কন্যা তাঁর, খোদা
তাঁকে কোনও পুত্রসন্তান দেননি। পুত্র না থাকলে বংশের মুখরক্ষা করবে কে! বিহার
শরীফে তাঁর দাদা বাকারের একটি পুত্র আছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ মকিম। ভাইপোর সঙ্গে কন্যার নিকাহ দেওয়ার কথা ভাবলেন তিনি। তবেই যদি বংশ বাঁচে!
সাদাত খান
বাহাদুর শাসিত এই অবধ রাজ্যের পাঁচ জেলা—খলিলাবাদ, ফৈজাবাদ, গোরখপুর, বহরাইচ আর
লখনউ। উত্তরে হিমালয়, পূর্বে বিহার, দক্ষিণে ইলাহাবাদের কারা মাণিকপুর আর পশ্চিমে
কনৌজ। বিরাট রাজ্য এই অবধ। স্থানীয় রাজা, জমিদার, জায়গিরদাররা ঔরঙ্গজেবের সময় থেকে
এই অঞ্চল লুটেপুটে খাচ্ছে। বিশেষ করে শেখজাদারা। সাদাত খান বাহাদুর অযোধ্যার কাছে
রাজপ্রাসাদ বানালেন, তৈরি হল নতুন শহর, তার নাম দেওয়া হল ফৈজাবাদ, এই হল খান
বাহাদুরের রাজধানী। সম্রাটকে প্রায় দু কোটি টাকা বার্ষিক রাজস্ব পাঠাতে লাগলেন
সাদাত খান। সম্রাট মহম্মদ শাহ প্রসন্ন হয়ে সাদাত খানকে আবার নতুন উপাধি দিলেন
“বুরহান-উল-মুলক”। অবধের মধ্যে ঢুকে গেল বারাণসী,
জৌনপুর, গাজীপুর আর চুনার। ইতিমধ্যে ভাইপো মুহাম্মদ মকিমকে রাজকার্যে সাহায্য করার
জন্য ডেকে নিয়েছেন নবাব। অবধের উপশাসক হলেন মুহাম্মদ মকিম। আবার নতুন খেতাব জুটলো
মুহাম্মদ আমিনের। তিনি হলেন “আবুল মনসুর”। ভাইপো হলেন সফদর জং। মুহাম্মদ আমিন ওরফে
সাদাত খান ভাইপোর হাতে অবধের দায়িত্ব তুলে দিয়ে দিল্লির রাজদরবারে এলেন উচ্চ পদ
নিয়ে। তিনি সম্রাট মহম্মদ শাহের বিশ্বস্ত লোক। ইতিমধ্যে ভাইপো মুহাম্মদ মকিম ওরফে
সফদর জং হয়েছেন মুহাম্মদ আমিনের জামাতা। একমাত্র কন্যা সদর-উন-নিসার সঙ্গে তাঁর
শাদি মুবারক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দিল্লির
রাজনীতি বড় জটিল। সে সবের সঙ্গে তাল মেলানো বেশ শক্ত মনে হচ্ছে আজকাল। অনেকটা হতাশ
হয়ে গিয়েই সেখানে বেশি দিন থাকতে পারলেন না সাদাত খান। বাজি রাওয়ের সঙ্গে সম্রাটের
দ্বন্দ্ব নিয়ে সাদাত খানের সঙ্গে মহম্মদ শাহের মনোমালিন্য হল। সাদাত খান সোজা
ফৈজাবাদ চলে এলেন। এর দিন কয়েক পর ভারত আক্রমণ করলেন নাদির শাহ, মুহাম্মদ আমিনের
নিজের দেশের লোক। সম্রাটের সাদাত খান দিল্লি গেলেন তাঁর সঙ্গে মোলাকাতের উদ্দেশে।
দু কোটি টাকা নিয়ে নাদির শাহ যাতে ভারত ছেড়ে চলে যায়, এমন প্রস্তাবও পাড়লেন।
কিন্তু সমস্ত কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিলেন আমিরুল উমরা আসফ জাহ। এমনিতে বাজি রাও নিয়ে
সম্রাট সাদাত খান ওরফে আমিনের উপর কিঞ্চিৎ রুষ্ট। সাদাত খান মনে বড় আঘাত পেলেন।
তিনি নাদির শাহকে সমস্ত কিছু খুলে বললেন এবং নিজেকে সরিয়ে নিলেন। নাদির শাহ আসফ
জাহকে গ্রেপ্তার করলেন আর লণ্ডভণ্ড করলেন দিল্লি শহর।
আঘাত সহ্য হল
না সাদাত খানের। সম্রাট যদি বিরূপ হন তাহলে জীবনের আর রইলটা কী!
সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে আর ওঠা সম্ভব নয়। এই সব ভাবতে ভাবতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।অল্পকালের
মধ্যে তাঁর হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে গেল, তিনি ইন্তেকাল করলেন। রেখে গেলেন স্ত্রী,
কন্যা, জামাতা, বাইশ লক্ষ সৈন্যবিশিষ্ট একটি বাহিনী, পঞ্চাশটি সাঁজোয়া আর কয়েক
কোটি টাকা।
সাদাত খানের
ইন্তেকালের পর অবধ রাজ্যের অধিকার নিয়ে গোলমাল দেখা দিল। এও অঞ্চলের জঙ্গলে বাঘের
উপদ্রব আছে, এ কথা শুনেছিলেন সাদাত খানের জামাই সফদর জং। সেই বাঘেদের কেউ কেউ এসে
লোকালয়েও হানা দেয় কখনও সখনও। গেরস্তের গরু বা ছাগল নিয়ে যায়। মানুষকে জখম করেছে।
কিন্তু বাঘের নামে এই লোকটা কোথা থেকে এল? বান্দার নাম শের সিং। উড়ে এসে জুড়ে বসল
সে! সে নাকি সাদাত খানের আর এক ভাইপো। সফদরের পিতা
ছাড়া সাদাত খানের যে আর ভাই আছে তাই জানে না কেউ, আর এ আবার ভাইপো! সে কথা তাকে
বোঝানো মুশকিল। শের জং গোঁফে তা দিতে দিতে বলল, তুমি সফদর জং, সাদাত খানের ভাইপো,
আমিও শের জং, আমার চাচাজানও সাদাত খান। তুমি রাজ্য পেলে আমিই বা পাব না কেন? সফদর
পড়লেন আতান্তরে। শেরকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী তোমার পিতার নাম? তোমার পিতামহই বা
কে? সে বলে পিতামহের নামটা ঠিকই বলছে, কিন্তু তাঁর পিতার নামটা খুব অচেনা। এই
অচেনা একটা লোকের সঙ্গে রাজ্যের কিছু লোক যোগ দিল। তারা ভুলেই গেছে যে সফদরের
রাজ্য শাসনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। তা ছাড়া তিনি
সাদাত খানের ভাইপোই শুধু নন, তাঁর একমাত্র কন্যার স্বামীও। শের জং ছাড়বার পাত্র নয়। সে বলে, এ হল আমার বাপের ভাই চাচার সম্পত্তি, আমি
আমার কোনও ভাবেই অংশ ছাড়ব না! তাতে জান যাই যাক! কে ক্ষমতা পেল বা পেল না, তা নিয়ে
নাদির শাহ-র অবশ্য মাথাব্যথা নেই। যত গোলমাল হয় তত তার কাছে ভাল। নাদির শাহ মঙ্গল-অমঙ্গল
বোঝেন না, তিনি টাকার ভাষাটাই কেবল বুঝতে পারেন। শের সিং নামক জাল ভাইপোকে ঠেকাতে
নাদির শাহ-র পথই ধরতে হল সফদরকে। তিনি রাজা লক্ষ্মীনারায়ণকে উকিল বানিয়ে তাঁর হাতে
দুই কোটি টাকা দিয়ে নাদিরকে নজরানা পাঠালেন। এর পর শের
সিং-কে সাফ করতে লাগল কয়েক মুহূর্ত। ধীরে ধীরে চাচা ও শ্বশুর সাদাত খানের সব
পদাঙ্ক অনুসরণ করতে লাগলেন সফদর। সম্রাট মহম্মদ শাহের প্রিয়পাত্র হতে বেশি সময়
লাগল না।অবধের পাশাপাশি তিনি কাশ্মীরের শাসক হলেন। নতুন খেতাব
জুটলো “মীর-এ-আতশ”। মুঘল প্রশাসনের শীর্ষপদ পেলেন সফদর জং। তিনি ওয়াজেদ আলি শাহ-র
উর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ।
অবধে এখন
অখণ্ড শান্তি বিরাজ করছে। কাশ্মীরও শান্তিপূর্ণ। এই অবধের পূর্ব নাম ছিল
লক্ষ্মণপুর। অযোধ্যাপতি রাজা দশরথের তৃতীয় পুত্র লক্ষ্মণের নামে। লঙ্কাবিজয়ের পর নরশ্রেষ্ঠ
রামচন্দ্র লখনউ এলাকা অনুজ লক্ষ্মণকে উপহার দিয়েছিলেন, বনবাস থেকে পরেই। অনুজের প্রতি অগ্রজের উপহার, বিপদের দিনে সর্বদা সহচর হওয়ার পুরস্কার। তার পর
থেকে এই এলাকার নাম হয় লক্ষ্মণপুর, তার পর সেখান থেকে লোকমুখে‘লখনউ’।
মুঘল সম্রাট
মহম্মদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আহমদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সফদর
জং-কে তাঁর প্রধানমন্ত্রী করেন এবং “হারেম”-এর দায়িত্ব প্রদান করেন। সফদর জং-এর
রাজ্য বাড়তে থাকে। তিনি অজমীঢ়েরও নবাব হলেন। এই সেই
অজমীঢ়, যার নামকরণ হয়েছিল পুরুবংশীয় হস্তীরাজের জৈষ্ঠ পুত্রের নামে। দুষ্মন্ত আর
শকুন্তলার পুত্র ভরত বহু রাজ্য জয় করে রাজচক্রবর্তী হয়েছিলেন। তাঁর বংশের এক রাজার
নাম হস্তী, তিনি হস্তিনাপুর নগর স্থাপন করেন। হস্তীর পুত্র অজমীঢ় যিনি ছিলেন
ধার্মিক রাজা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নগরের নাম অজমীঢ়।অজমীঢ়ের অধস্তন তৃতীয় পুরুষ হলেন
কুরু রাজা, তিনি যেখানে তপস্যা করেন সেই স্থানই পবিত্র কুরুক্ষেত্র। কুরুর অধস্থন
অষ্টম পুরুষের নাম শান্তনু। শান্তনুর পৌত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। তাঁদের ছেলেরা
মহাযুদ্ধে রত হয়ে পরস্পরকে নিধন করেছিল।
মীর-এ-আতশ
সফদর জং এক দিকে অযোধ্যার নবাব, অন্যদিকে পুণ্যতীর্থ অজমীঢ়ও তাঁর দখলে। কাশ্মীর-এর
অধিকার ছাড়াও তিনি পেলেন নরনাউলের ফৌজদারের দায়িত্ব। এত দায়িত্ব একা হাতে সামলাবেন
কী করে! বাইরের লোকের উপর তত বিশ্বাস রাখা যায় না। তাই পুত্র জালালুদ্দিন হায়দারকে
সোইন্যবাহিনীর প্রধান করে দিলেন। পুত্রের নতুন নামকরণ হল “শুজা-উদ-দৌলা”। দিল্লির
হাতে নামেই ক্ষমতা ছিল। ভারতের প্রধান শাসক হয়ে উঠলেন সফদর জং। মাঝেমধ্যে তাঁর মনে
পড়ে পিতার কথা। পিতা তাঁকে এক দরবেশের কথা বলেছিলেন। কে ছিলেন সেই দরবেশ? তিনি কি
তাঁর পূর্বপুরুষ সপ্তম ইমাম মুসা ইবনে জাফর, কারাগারের মধ্যে যাঁর মৃত্যু হয়েছিল?
সাচ্চা ইমামের কোনও দিন মরণ হয় না। তাঁরা থাকেন গায়েবে। সেই গায়েব থেকেই কি তিনি
হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে উত্তরপুরুষকে সৌভাগ্যের সন্ধান বলে দিয়েছিলেন? তবে দিল্লির
রাজনীতির প্রধান হয়েও তিনি অবধকে কখনও অবহেলা করেননি। অবধ ছিল তাঁর বাড়ি, প্রজারা
ছিল তাঁর পরিবারের সদস্য। সফদর জং দুর্নীতির সঙ্গে আপোষ করেননি কোনও দিন। আর সেটাই হল তাঁর কাল! সম্রাট আহমদ শাহ-র সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হল। চাচার মতো
সফদর ভগ্ন হৃদয়ে অবধে প্রত্যাবর্তন করলেন। শরীরও যেন ভেঙ্গে পড়েছে তাঁর। সূর্য তখন
মধ্যগগনে, যৌবনও তাঁকে ছেড়ে চলে যায়নি, এমন সময় দিনমণি অস্তে গেলেন। অবধের কবিরা
কেঁদে উঠলেন। শিল্পীরা তুলি হাতে আঁকতে লাগলেন সফদরের মুখচ্ছবি। পণ্ডিত বইয়ের পাতা
ওলটাতে ভুলে গেলেন।
নতুন নবাব
শুজা-উদ-দৌলা রাজধানী ফৈজাবাদ থেকে সব প্রজাদের উদ্দেশে বললেন, আপনারা শোক কাটিয়ে
উঠুন। আমার পিতা সফদর জং গায়েব থেকে সব অবলোকন করছেন। তাঁর প্রার্থনায় আপনারা সুখে
আর শান্তিতে বসবাস করুন।
সুখ বড়
বেয়াড়া চিজ। দেশীয় কোনও রাজা শুজা-উদ-দৌলা-র টিকিও ছুঁতে পারে না, দাড়িতে হাত
রাখতে পারে না কোনও নবাব। এতই ক্ষমতাবান তিনি। কিন্তু বিদেশীরা সে কথা মানবে কেন!
কে এই শুজা-উদ-দৌলা? কী ক্ষমতা তাঁর? এক দল বিদেশীয় বণিক সেই প্রশ্ন তুলল।
শুজা-উদ-দৌলা প্রমাদ গণলেন। মীরকাসিমের সঙ্গে একজোট হয়ে তিনি সেই বিদেশীদের সঙ্গে
যুদ্ধে নামলেন, যাকে বক্সারের যুদ্ধ বলা
হয়। কিন্তু এ বড় ধাক্কা! পরাজয়! বিদেশী বণিক জাতিতে ব্রিটিশ, কোম্পানির নাম ইস্ট
ইণ্ডিয়া। তাদের হাতে তুলে দিতে হল সাধের কারা জাহানাবাদ। মারাঠাদের সাহায্য কোনও
কাজেই এল না। ইলাহাবাদের চুক্তি অনুযায়ী শুজা-উদ-দৌলা তাদের বার্ষিক পঞ্চাশ লাখ
টাকা অবধ থেকে নিয়মিত দেবেন ঠিক হল। ব্রিটিশরা অবধে অবাধে বাণিজ্য করার স্বাধীনতা
পেল। কোম্পানি জানিয়ে দিল, শুজা-উদ-দৌলার সৈন্যসংখ্যা ৩৫ হাজার অতিক্রম করতে পারবে
না।
এর ঠিক তিন
বছর আগে শুজা-উদ-দৌলা পানিপথের যুদ্ধ অংশ নিয়েছেন। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরকে
হত্যা করা হলে অন্যতম চক্রী প্রিন্স আলি গওহর পালিয়ে বেড়ায়। তাকে আশ্রয় দেন
শুজা-উদ-দৌলা। গওহরের সঙ্গে শুজার কথা হয়, সে যদি মুঘল সৈন্যবাহিনীকে ব্রিটিশদের
বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে পারে তবে তিনি ও নাজিব-উদ-দৌলা মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে
নামতে প্রস্তুত। মারাঠাদের বড্ড বাড় বেড়েছে। ওদিকে আফগানিস্তানের রাজা আহমদ শাহ
দুররানির পক্ষে যোগ দিয়ে শুজা-উদ-দৌলা মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলেন। শুজা
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান উজির হিসাবে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। মারাঠারা গোহারা
হেরে যায়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে শুজা-উদ-দৌলার বন্ধুত্ব যেমন ছিল,
তেমনি শুজা ছিলেন সম্রাটের ভীষণ অনুগত। আসাদপুরের যুদ্ধে শুজা-উদ-দৌলা হাফিজ রহমত
খান নামক জনৈক বীরের সাহায্যে মারাঠাদের দিল্লি থেকে তাড়িয়ে দেন। ব্রিটিশরা কিন্তু
গলার কাঁটা হয়ে থেকেই গেল। তাদের কোনও ভাবে তাড়ানো গেল না।মাতামহ সাদাত আলি খান
এবং পিতা সফদর জং-এর মতো শুজাও অল্প বয়সে রাজধানী ফৈজাবাদে মারা যান। তাঁকে দাফন
করা হয় গুলাব বাড়িতে।
গুলাব বাড়ির
আনাচে কানাচে শুজার মৃত্যু নিয়ে নানা কাহিনি ঘোরাফেরা করে। তাঁর এই অকাল মৃত্যু
নাকি ভারি রহস্যজনক! তিনি অত্যন্ত বিলাসী ও রমণীপ্রিয় নবাব-ওয়াজির ছিলেন। ইংরেজরা
তাঁর উপর যে অত্যাচার করেছিল, তার ফলে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন বারবণিতা ও
নর্তকীপ্রিয় শুজা-উদ-দৌলা। ভ্রমণ আর শিকার যেমন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল তেমনি
নাচ-গানেও মত্ত থাকতে ভালবাসতেন তিনি।
শুজা-উদ-দৌলা
ইংরেজদের নজরানা দিতে ভালো রকম হিমশিম খাচ্ছিলেন। তিনি ভাবলেন, এই টাকা অন্যদের
কাছ থেকে তুলবেন তিনি। সেই ভেবে রোহিলাদের নবাব হাফিজ রহমত খান বারেচের কাছে বেশ
কিছু টাকা চেয়েছিলেন। সেই রহমত খান টাকা দিতে রাজি হননি,
মুখে বলেছিলেন, অত টাকা কোথায় পাব জনাব! শুজা-উদ-দৌলা রেগে কাঁই। তখন তিনি ওয়ারেন
হেস্টিংস আর আলেকজান্ডার চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়ে রোহিলাখণ্ড আক্রমণ করেন।
যুদ্ধ হয়েছিল মীরণপুর কাটরায়। হাফিজ রহমত খান নিহত হন। যুদ্ধে জিতেও শুজা তাঁর
রাজ্য দখল করতে পারেন না। মাঝখান থেকে নেপো এসে দধি ভক্ষণ করে। বরিলি, পিলভিট ও
শাহজাহাঁপুর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দখলে চলে যায়। এর কিছু দিন পর রমণিবিলাসী
শুজা-উদ-দৌলা রহমত খানের কন্যাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। শুজা-উদ-দৌলা সোজা তাঁকে
বিছানায় নিয়ে এসে তোলেন। হাফিজ-কন্যা পিতার মৃত্যুর কথা ভোলেননি। তিনি হয়তো ইচ্ছে
করেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন নবাবের কাছে। সুন্দরী-আসক্ত নবাব বুঝে উঠতে পারেননি কী
ঘটতে চলেছে! সেই কন্যার কাছে ছিল বিষমেশানো ছুরিকা। নবাব যখন ভোগের নেশায় মশগুল,
ঠিক সেই সময় সেই অস্ত্র তিনি বসিয়ে দেন শুজার উরুতে। শুজা-উদ-দৌলার হারেমের এক
বাঁদির মুখ থেকে সেই কিসসা বেরিয়ে পড়ে বাইরে। হাফিজ-কন্যার কী হয়েছিল তার পর, সে
কথা অবশ্য জানা যায় না।
শুজা-উদ-দৌলামারা
যাওয়ার পর তাঁর পুত্র আসফ-উদ-দৌলা অবধের নবাব হলেন। রাজধানী ফৈজাবাদ থেকে চলে এল
লখনউয়ে। ইংরেজরা নতুন নবাব আসফবাবুকে মনের সুখে দোহন করতে লাগল। কখনও তারা বলে, এই
টাকা আসফ-উদ-দৌলা দিচ্ছেন শান্তির জন্য, কখনও বলে, এই টাকা তো মৈত্রীর জন্য দিতে
হবেই, আবার সুযোগ পেলে এও বলতে ছাড়ে না, নবাবের সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানির জোট
নিখুঁত আর অতীব সুন্দর, ফলে তার মূল্য তো চোকাতেই হবে।। শুধু টাকা নয়, অবধ রাজ্য এ বার
আয়তনেও ছোট হতে লাগল। এই এলাকা থেকে একে একে বেরিয়ে গেল বারাণসী, জৌনপুর আর
গাজীপুর। সেখানে রাজা বা সুবেদার থাকল বটে, কিন্তু সে সবের আসল মালিক হল ব্রিটিশ
কম্পানি। মাসে আসফ-উদ-দৌলাকে নজরানা দিতে হয় ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। পিতার মৃত্যুর
সময় দিতে হত ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। ইংরেজদের চাহিদা রোজ রোজ
বেড়েই চলেছে। কোম্পানি একটি অস্থায়ী ব্রিগেড তৈরি করল নবাবের টাকায়। অবধের
সৈন্যবাহিনীতে ইংরেজ কর্তাব্যক্তি নিয়োগ করতে বাধ্য হলেন তিনি, তাঁরাই সেনাবাহিনী
চালায়। এর পরে নবাবকে বলা হল, তিনি যেন প্রশাসনকে আরও দক্ষ করেন
এবং প্রজাদের অবস্থার দিকে দৃষ্টি দেন। আসফ-উদ-দৌলার কিছু করার ছিল না। ও দিকে
ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছেন ভাই সাদাত আলি খান। তাঁর বড় ইচ্ছা নবাব হওয়ার। অবশ্য
সাদাতের চরিত্র আর দক্ষতা নিয়ে নবাব আসফ-উদ-দৌলা কিঞ্চিৎ সন্দিহান। একটু বেচাল
হলেই কোম্পানি ভাই সাদাত আলিকে নবাব বানিয়ে দেবে! ইনি দ্বিতীয় সাদাত আলি।এ দিকে আসফ-উদ-দৌলা
সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন, কাজের লোকের মাইনে মাসের পর মাস বাকি, পরিবারের
সদস্যদের ন্যূনতম অর্থ দিতে পারছেন না তিনি। তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই সেই সব
দুঃখের কথা জানালেন ওয়ারেন হেস্টিংসকে। তিনি নবাবের কথা মন দিয়ে শুনলেন এবং মেনে
নিলেন। বণিক ওয়ারেন হেস্টিংস এ বার এক ফন্দি আঁটলেন। তিনি নবাবের উজির মুর্তাজা
আলি খানকে সঙ্গে নিয়ে বেগমদের মহল লুটপাট করলেন। আসফ-উদ-দৌলার মা বেগম উম্মত-এ
জোহরা বানু ওরফে বহু বেগম ফৈজাবাদে, তাঁর কাছে কয়েক লাখ টাকা চাইলেন পুত্র। শেষ
পর্যন্ত নবাবও দেখলেন, বেগমদের সম্পত্তি লুট না করতে পারলে এই দুর্দিনে টিকতে
পারবেন না। মুর্তাজা আলি ও রেসিডেন্ট জন ব্রিস্টোর সঙ্গে মিলে লুট করলেন প্রায় ৩৭
লক্ষ টাকা আর কিছু মূল্যবান গয়নাগাটি। পরে হায়দার বেগ ও মিডলটন
সাহেব গভর্নর জেনারেলের নির্দেশে মহল থেকে টাকা আর মূল্যবান জিনিস নিয়ে চলে যান। আস্তে আস্তে দেখা গেল, রাজ্যের উজির-নাজির, চাকর-বাকর সবাই
ইংরেজের কথা শুনে চলে। নবাবকে কেউ পাত্তাই দেয় না। হাতে-গোনা কয়েক জন ছিলেন নবাবের
শুভাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু তাঁদের নিত্য অপমান সহ্য করতে হত, শাস্তির মুখেও পড়তেন
তাঁরা। সৈন্যবাহিনীর উপর নবাব নিয়ন্ত্রণ হারালেন। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত
আসফ-উদ-দৌলা খুব শীঘ্রই মারা গেলেন।
সারা জীবন অর্থকষ্টে থেকেও আসফ-উদ-দৌলা প্রাসাদ, বাজার, বাগিচা, ইমামবাড়া,
রুমি তোরণ বানিয়ে গেছেন। তাঁকে ‘লখনউয়ের শাহজাহান’ বলে ডাকা হয়। পাঁচ লাখ টাকা খরচ
করে হোলি উৎসব পালন করতেন। পালিত পুত্র ওয়াজির আলি খানের বিয়েতে খরচ করেন ৩০ লাখ
টাকা। ইসলামে পালিত পুত্র মান্য করা হয় না।
পিতা যেমন তার ঔরসজাত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার
করতে পারেন না, তেমনি যে সন্তান তাঁর ঔরসজাত নয় তাঁকে পুত্র বানানো তাঁর অধিকারের
মধ্যে পড়ে না। কিন্তু এই কাজটাই করে বসে আছেন আসফ-উদ-দৌলা। জাহিলিয়াতের যুগে আরবরানি জের স্বার্থসিদ্ধির
উদ্দেশে যাকে খুশি পালিত পুত্র বানিয়ে তার বংশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করত, যাকে ইচ্ছা নিজের পুত্র বানিয়ে নিত। আর এই পালিত পুত্রের কর্তব্য এবং অধিকার ঠিক নিজের ঔরসজাত পুত্রদের মতই হতো। যেমন হতে চলেছে ওয়াজির আলি খানের ক্ষেত্রেও। এই
প্রশ্নটা উঠল প্রাসাদের অন্দরমহলেই।
যিনি পালিত
পুত্র গ্রহণ করেন তিনি তাঁকে উত্তরাধিকারীও বানান। এতে আসল উত্তরাধিকারীরা বঞ্চিত
হয়। এক্ষেত্রেও তাই হল। গোপন ক্ষোভ ও হিংসা জেগে উঠল নিজের বংশেই। আসফ-উদ-দৌলার ভাই সাদাত আলি
প্রকাশ্যে বলতে লাগলেন, পবিত্র কুরআনে আছে, “তোমাদের মুখে-ডাকা পুত্রদের
খোদা তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানিয়ে দেননি। এতো তোমাদের মুখনিঃসৃত কথামাত্র। কিন্তু আল্লা হইতো সত্যকথা বলেন, সঠিক ও নির্ভুল পথের সন্ধান দেন। ওদের ডাক ওদের পিতাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে।আল্লাহর কাছে এটাই অধিকতর ইনসাফপূর্ণ কথা।কিন্তু ওদের পিতা যদি তোমাদের জানা না থাকে তাহলে ওরা তোমাদের দ্বীনিভাই মাত্র। তোমাদের সাহায্যকারী বন্ধু।’’ মৌলবি-মৌলানারাও বলতে
লাগলেন, ওয়াজির আলি আসল উত্তরাধিকারী নয় কারণ সে পালিত পুত্র। আর মুখে ডাকা পুত্র
কিংবা ধর্মপুত্র অন্তঃসারশূন্য কথা, এর কোনও ভিত্তিই নেই।
কিন্তু আসফ-উদ-দৌলা মারা যাওয়ার পর এই পালিত পুত্রই সিংহাসনে বসলেন। ওয়াজিরের মা ছিলেন আসফ-উদ-দৌলার হারেমের এক বাঁদি আর পিতা
নাকি ধোপা! এ হেন ‘পুত্র’ পাবে নবাবি? হরগিজ না! তাই ওয়াজিরের অভিষেকের পরেই
আসফ-উদ-দৌলার মা বেগম উম্মত-এ জোহরা বানু ওরফে বহু বেগম ইংরেজদের চিঠি লিখলেন যে
এই পুত্র আসফের নয়, সুতরাং তাঁর নবাব হওয়ার কোনও অধিকার নেই। সেই মর্মে সমস্ত কথা
খুলে পত্র প্রেরণ করা হল গভর্নর জেনারেলকে। কিন্তু ওয়াজিরকে তক্ষুনি সরানো সম্ভব
হল না কারণ প্রজারা ছিল তাঁর পক্ষে। ওয়াজির নাকি বীর, সেই পারবে ইংরেজদের শাসন
করতে, এই রকম একটা ধারণা অবধের মানুষের মনে দৃঢ়মূল ছিল।কিন্তু মাস চারেক যেতে না
যেতে ইংরেজরা এই নবাবকে সন্দেহ করতে লাগল। গভর্নর জেনারেল স্যর জন শোর তাঁকে মসনদ
থেকে নামিয়ে দিয়ে আসফ-উদ-দৌলার ভাই সাদাত আলি খানকে নবাব বানালেন। সাদাত আলি বহু
দিন অপেক্ষা করে আছেন, নবাবি পাবেন এই আশায়। ইনি হলেন দ্বিতীয় সাদাত আলি খান, যিনি
ওয়াজেদ আলি শাহ-র উর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ।
ওয়াজের আলির তল্পিতল্পা বেঁধে তাঁর হাতে ৩ লক্ষ টাকা ধরিয়ে দিয়ে
বারাণসীতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। সেখানে রয়েছে ইংরেজদের বসানো এক হিন্দু রাজা।বারাণসী
থেকে লখনউ খুব দূরে নয়। তাই ইংরেজরা সেখানেও তাঁকে রাখাটা নিরাপদ মনে করল না।
কোম্পানি তাঁকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করল। কারণ তারা জানে যে ওয়াজের
আলি তাঁর পালক পালক পিতার মতো নরম ধাতের মানুষ নন। এ ছোকরা হল জেদী আর একরোখা। কখন
যে কী করে বসে, তার আঁচ পাওয়া যায় না। অতএব বারাণসীর রেসিডেন্ট জর্জ চেরি গদিচ্যূত
নবাবকে প্রাতরাশে নিমন্ত্রণ করলেন। বারাণসী থেকে তাঁকে আরও দূরে চলে যেতে বলবেন।
ওয়াজের নিমন্ত্রণের চিঠি পেয়ে উৎফুল্ল হলেন। সেই মোতাবেক ধোপদুরস্ত ফিরিঙ্গি
পোশাকে তিনি চেরির বাসভবনে গেলেন। প্রাতরাশের টেবিলে বসে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া শুরু
হল। এলাহি সেই প্রাতরাশ। ওয়াজের খুব প্রসন্ন। হঠাৎ চা পান করতে করতে চেরি তাঁকে একটি
আদেশনামা ধরিয়ে দিলেন, তাতে লেখা ওয়াজেরকে দু চার দিনের মধ্যেই বারাণসী ছেড়ে চলে
যেতে হবে। রীতিমতো অপমানিত বোধ করলেন প্রাক্তন নবাব। তিনি সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে
চেরি সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন। সেই ভাবেই ঘুরতেন তিনি। নবাবি চলে গেলে কী হবে,
ঠাটবাট রয়ে গিয়েছে ষোলো আনার উপর আঠারো আনা।বারাণসী ত্যাগ করার আদেশনামা পেয়েই
ওয়াজের রীতিমতো খেপে ওঠেন। তর্ক করতে থাকেন রেসিডেন্ট চেরির সঙ্গে। কে আপনি? আপনি
বললেই কি আমাকে চলে যেতে হবে? আমি আপনার গোলাম নই!চেরি ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিলেন, এ
আমার হুকুম নয়, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের ফরমান। ওয়াজির মুখে যা এল তাই বলতে শুরু
করলেন। চোস্ত ইংরেজি বলতে পারেন তিনি। রাগের মাথায় সেই বিদেশি ভাষা যেন বেশি গড়গড়
করে বেরোতে থাকল। পরিবেশ রীতিমতো উত্তপ্ত। চেরির মস্কিষ্ক ঠাণ্ডা। তিনি আস্তে আস্তে কথা বলে
ওয়াজেরকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর ফাঁকে ওয়াজের আলি আচমকা চেরির মুখে
সজোরে একটি ঘুষি চালিয়ে দিলেন। গলগল করে নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। ঘটনাপ্রবাহেরএই আকস্মিকতায়
চেরি হতভম্ব হয়ে গেলেন। তাঁকে আরও অবাক করে দিয়ে ওয়াজেরের দেহরক্ষীরা চেরিকে
আক্রমণ করে বসল। মারের পর মার। চেরি নিরস্ত্র। তাঁকে ও তাঁর আরও দুজন
ইংরেজ অনুচরকে ওয়াজেরের দেহরক্ষীরা হত্যা করে ফেলল।তার পর বেরিয়ে পড়ল বারাণসীর
রাস্তায়। কিন্তু সেখানেই শেষ হল না আক্রমণ-পর্ব। বারাণসী থেকে চলে যাওয়ার যে
আদেশনামা ওয়াজের চেরির কাছে পেয়েছেন তার মূল কারিগর যিনি, বারাণসীর সেই
ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েল ডেভিসের বাড়িতে এ বার ওয়াজের সদলবলে চড়াও হলেন। ডেভিস
বিচক্ষণ মানুষ।তিনি সিঁড়ির নীচে লুকিয়ে পড়ে কোনওক্রমে প্রাণ রক্ষা করলেন। বেশ কিছু
ক্ষণ পর ব্রিটিশ বাহিনী এসে স্যামুয়েল ডেভিসকে উদ্ধার করে। দেহরক্ষীসমেত ওয়াজের
আলি তখন ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়েছেন। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না তাঁকে।
অজ্ঞাতবাসে প্রাক্তন নবাব সৈন্য
সংগ্রহ করতে লাগলেন। পেয়েও গেলেন বেশ কিছু লোককে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে অনেকেরই ক্ষোভ
পুঞ্জিভূত হয়ে ছিল। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগালেন তিনি। কয়েক দিন পরেইএকরোখা ও জেদী
ওয়াজের আলি সেই কয়েক হাজার সৈন্য নিয়ে বারণসী আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। ততদিনে
ইংরেজরাও সতর্ক হয়েছে। তারা এ রকমই কিছু আঁচ করেছিল। শেষমেশ ব্রিটিশ বাহিনীর
তৎপরতায় তাঁকে পালিয়ে যেতে হয়। ইংরেজ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল
এরসকিন।ওয়াজের নিজের ক্ষমতা বুঝতে পারেন। চলে যান রাজপুতানার একটি অখ্যাত জায়গায়,
সেই জায়গার নাম বুতওয়াল। জয়পুরের রাজা তাঁকে আশ্রয় দেন। শেষমেষ সেখানেও ধাওয়া করে
ইংরেজ সৈন্য। ওয়েলেসলি ও আর্ল অব মর্নিংটোন ওয়াজেরকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার
অনুরোধ করলে জয়পুরের রাজা বলেন, তিনি ওয়াজিরকে তাঁদের হাতে তুলে দেবেন কিন্তু
শর্তসাপেক্ষে। ওয়াজেরকে ফাঁসিতে ঝোলানো যাবে না কিংবা শৃঙ্খলিত করা যাবে না।
ওয়াজেরকে ইংরেজরা নিয়ে আসে কলকাতায়, ফোর্ট উইলিয়মে তাঁকে কঠোরভাবে বন্দি করে রাখা
হয়। জীবনের শেষ দু দশক আসফ-উদ-দৌলার এই পালিতপুত্রকে ভেলোরের এক কারাগারে লোহার
খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তিন পুত্র আর এক কন্যা রেখে যান তিনি। দ্বিতীয় পুত্র
মুবারক-উদ-দৌলা তুরস্কে চলে যান।
এর পর ইংরেজরা মসনদে বসায়
শুজা-উদ-দৌলার আর এক পুত্র সাদাত আলি খানকে। সাদাতের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি বার্ষিক ৭৬ লক্ষ টাকা নজরানা নিত। তাতেও সন্তুষ্ট নয় তারা। অবশেষে ইলাহাবাদ
কেল্লা আর ফতেগড়দিয়ে দিতে হল ইংরেজকে, সঙ্গে বারো লক্ষ টাকা। অবধের সেনা কমাতে
বললেন গভর্নর। মাত্র তিন বছরে সাদাত আলি খানের রাজ্য অর্ধেক হয়ে গেল। রোহিলাখণ্ড,
ফারুখাবাদ, মইনপুরি, ইতবা, কানপুর, আজমগড়, বস্তি, গোরখপুর সাদাত আলির রাজ্যের
বাইরে চলে গেল। সাদাত আলি খান মিতব্যয়ী মানুষ ছিলেন। শিকারে যেতেন না, মদ খেতেন
না, রমণীবিলাসও ছিল না তাঁর। তিনি তিল তিল করে বিশ কোটি টাকা সঞ্চয় করে ফেললেন। তবে
এরই ফাঁকে কয়েকটি দর্শনীয় ইমারত বানিয়ে গেছেন তিনি। কায়জারবাগ আর দিলখুসার বেশির
ভাগ সুন্দর ইমারত সাদাত আলির তৈরি। দিলখুসা কোঠিও তাঁর বানানো। কায়জারবাগে তাঁর সমাধি,
স্ত্রী খুরশিদজাদির পাশেই।
সাদাত আলির মৃত্যুও বেশ
রহস্যজনক। তাঁর এক শ্যালকের নাম ছিল রমজান আলি খান। ভাগ্নে গাজিউদ্দিন যাতে
তাড়াতাড়ি নবাব হতে পারেন আর তিনি তখন হবেন উজির এই আশায় তিনি নাকি নবাবের বিশ্বস্ত
অনুচর জওহর আলিকে দিয়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে দেন। নবাব সাদাত আলি সেই খাদ্য খেয়ে মোতি
মহলের বিছানায় ঘুমোতে যান। তার পর আর ওঠেননি।
সাদাত আলির তিরোধানের পর তাঁর
পুত্র গাজিউদ্দিন হায়দার নবাব-বাহাদুর হলেন। নামেই নবাব তিনি, সব সিদ্ধান্ত নেয়
ব্রিটিশ কোম্পানি। এর মধ্যে হঠাৎ গাজিউদ্দিনের পদোন্নতি হল তিনি নবাব থেকে হয়ে
গেলেন রাজা। নবাবের চেয়ে রাজা অনেক বড়। তাছাড়া নবাব তো দিল্লির বাদশার কাছে
দায়বদ্ধ। এখন গাজিউদ্দিন রাজা হওয়া মানে দিল্লির আনুগত্য স্বীকার করতে হবে না।
পিতার সব সন্ধি গাজিউদ্দিন অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলেন, বাধ্য চাকরের মতো। এর
মধ্যে পিতার বিবাহিত বেগমরা একে একে ইন্তেকাল করতে লাগলেন। সেই সব বিধবাদের সারা
জীবনের সঞ্চিত সব সম্পত্তি কোম্পানি অধিকার করে। অথচ সে সব পাওয়ার কথা
গাজিউদ্দিনের। অবশ্য গাজিউদ্দিন সে সব দাবিও করেননি, ইংরেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক
ছিল বেশ মধুর। এই গোলামির মাঝেও তিনি কাব্যচর্চা করতেন। নিজে তেমন লিখতে না পারলেও
গাজিউদ্দিন হায়দারের দরবারে কবিরা বিশেষ ভাবে সম্মানিত ছিলেন।
গাজিউদ্দিনেরপরনবাবহলেনতাঁর ‘পুত্র’ নাসিরউদ্দিন হায়দার। অবশ্য নাসিরউদ্দিন গাজিউদ্দিনের ছেলে কিনা, তা নিয়ে ঘোরতর
সন্দেহ করছেন অনেকে। তাঁদের কথা অনুযায়ী, গাজিউদ্দিনের কোনও পুত্র নেই, তাঁর
একটি মাত্র সন্তান, সেটি আবার কন্যা। সেই মেয়ের নিকাহ হয়েছিল রাজপরিবারেই, এক তুতো
ভাইয়ের সঙ্গে। গাজিউদ্দিনের কন্যার ছেলে হল মোসেম-উদ-দৌলা, যিনি মসনদের প্রকৃত
দাবিদার ছিলেন। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে নাসিরউদ্দিনকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন
গাজিউদ্দিন। কেন? কে এই নাসিরউদ্দিন? তিনি নাকি এক ক্রীতদাসীর সন্তান, যে
ক্রীতদাসীর প্রেমে মশগুল ছিলেন গাজিউদ্দিন। তবে নাসিরউদ্দিনের পিতা কে? তিনি
প্রাসাদের এক ভৃত্য, জামাকাপড় পরিষ্কার করা ছিল যাঁর কাজ ছিল। সেই ধোপাকে অবশ্য পৃথিবী থেকে
সরিয়ে দিয়েছিলেন গাজিউদ্দিন।
মসনদে বসেই রাজা নাসিরউদ্দিন
বিলাসব্যসনে মজে গেলেন। শুধু পোশাক-আশাক আর ভোজন-বিলাস নয়, মদের ফোয়ারা ছুটতে লাগল
সর্বত্র। বিদেশ থেকে আসতে লাগল দামী সুরা। দেশি পানীয় তো
আছেই। তার উপর নাসিরউদ্দিনেররমণীবিলাস প্রায় রূপকথার মতো।তিনি কখনও প্রেয়সীদের কাছে এক
পোশাকে যান না। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ কখনও ফার্সি ঘরানার আবার কখনও খাঁটি ইংরেজের
কেতায় তিনি পায়চারি করেন। বাহারি চুল কাটার জন্য রেখেছেন সাহেব নাপিত, সেই গোরা
নাপিতের অফিস দেখলে মন্ত্রীদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়।তিনি পড়াশুনো করেন ইংরেজ
শিক্ষক রেখে। ছবি আঁকার গুরু থেকে গ্রন্থাগারের রক্ষক, সবই গোরাবাহিনীর দখলে।
এমনকি সেনাবাহিনীর প্রধান করে দিলেন এক সাহেবকে। হারেমে রাখলেন এক মেম সাহেবাকে
যিনি নাসিরউদ্দিনের অন্যতম মহিষী। অবশ্য তাঁর প্রধান মহিষী ছিলেন সুলতানা বোয়া।
আফজল মহল নামের আরএকজন বেগম ছিলেন নাসিরউদ্দিনের। এই বেগমেরই বিতর্কিত পুত্র
মুন্না জান। মুঘল সম্রাট শাহ আলমের এক নাতনির সঙ্গে নিকাহ হয়েছিল নাসিরের। কিন্তু
সেই বিয়ে টেকেনি। নাসিরউদ্দিন হায়দার ‘ছোট জাত’ বলে ওই বেগম প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান।
যাওয়ার সময় তিনি বলে গিয়েছিলেন, বাঁদি আর ধোপার ছেলের সঙ্গে জালিয়াতি করে তাঁর মতো
মুঘলজাদীর নিকাহ দেওয়া হয়েছিল।শাহ আলমের নাতনি চলে যাওয়ায় একটি বেগমের শয্যা খালি
হয় আর সেই ফাঁকা জায়গায় আসেন এক হিন্দু মহিলা, সঙ্গে একটি পুত্র ও একটি কন্যা।
স্বামীকে বাইরেই রেখে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন কুর্মি সম্প্রদায়ের। কুর্মিরা মুলত
কৃষিকর্মী। এই মহিলার নাম দুলারি। আফজল মহলের পুত্র ফরিদুন বখত ওরফে মুন্না জানের
ধাইমা হিসাবে তিনি প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতে দুলারি নবাবকে জাদু করে
ফেলল। নবাব তাঁর প্রেমে এমন মশগুল হলেন যে তাঁকে নিকাহ করে বেগম বানিয়ে ফেললেন।
দুলারির আগের পক্ষের ছেলে আর মেয়েকে নিজের পুত্রকন্যা বলে ঘোষণা করলেন।দুলারির
নতুন নাম হল মালিকা জামানি। গাজিউদ্দিন যখন বেঁচেছিলেন তখন তিনি মুন্না জানকে
নাসিরউদ্দিনের পুত্র বলে মানতে চাননি। নাসিরউদ্দিন হায়দার এ বার নিজেই বললেন,
মুন্না জান নয়, তাঁর উত্তরাধিকারী কৈয়ান জাহ, দুলারির পুত্র। ইংরেজ রেসিডেন্ট হতবাক। তিন
বছরের কৈয়ান জাহকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদে ঢুকেছিলেন দুলারি, সে কী করে নাসিরের পুত্র
হয়! অবশ্য পরে তিনি মত বদলে বলেছিলেন, মুন্না জান বা কৈয়ান জাহ কেউ তাঁর পুত্র নয়।
নাসিরউদ্দিনের ছিল বিচিত্র সব
শখ। তিনি ফারহাত বখশ প্রাসাদে দর্শন ভিলা বানিয়েছিলেন। ফারহাত বখশ বানিয়েছিলেন
বিখ্যাত স্থপতি ক্লড মার্টিন।আবার জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষচর্চায় ছিল নাসিরউদ্দিনের
অপরিসীম আগ্রহ। লখনউয়ে ‘তারা কোঠি’ নামে একটি জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
করেন। পাখিদের লড়াই কিংবা বাঘেদের যুদ্ধ দেখা ছিল ছিল তাঁর প্রধান বিনোদন। রাজার
চিড়িয়াখানা ছিল দেখার মতো। ‘কাগরা’ নামের একটি অতিকায় বাঘ ছিল তাঁর চিড়িয়াখানার
গর্ব। আর এই সব শখ-আহ্লাদ মেটাতে গিয়ে রাজত্বের রাশ বেরিয়ে গেল তাঁর হাত থেকে।
উজির হাকিম মাহদি, পরে রওশন-উদ-দৌলার হাতে যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।
নাসিরউদ্দিন পড়ে থাকতেন হারেমে। কখনও কখনও তাঁকে স্ত্রীলোকের পোশাকেও দেখা যেতে
লাগল। তিনি কখনও নাচছেন আবার সুর করে গাইছেন আবোল-তাবোল।
এত কিছু করেও নাসিরউদ্দিনের মন
ভাল হয় না। তিনি সর্বদায় মৃত্যুভয়ে কাঁপেন। এই বুঝি তাঁর খাবারে কেউ বিষ মিশিয়ে
দেয়। যে সাহেব তাঁর চুল কাটতো তাকে বিশ্বাস করতেন রাজা। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পর
রাজা পড়লেন খুব বিপদে। কারও হাতে জল পর্যন্ত খান না। নিজে একটি কুয়োতে তালা লাগিয়ে
সেখানকার জল পান করতেন। সদা সতর্ক থাকার মধ্যেই একদিন তাঁর নিজের দুই বোন ধুনিয়া
আর দুলভী তাঁর শরবতে বিষ মিশিয়ে দেয়। উজির রোশন-উদ-দৌলা মোটা পারিতোষিকে তাঁদের
নিয়োগ করেন।
রাজা নাসিরউদ্দিনের মৃতদেহ ঘরে
শায়িত, তখন প্রায় গৃহযুদ্ধ বেধে গেল লখনউতে। রাজ্যের মানুষ চাইছেন ফরিদুন বখত ওরফে
মুন্না জান রাজা হোক। তাঁকে সমর্থন করছেন তাঁর দাদি পাদশা বেগম। কিন্তু ইংরেজরা তা
চায় না। তাঁরা নাসিরুদ্দিনের চাচা, গাজিউদ্দিনের ভাই মুহাম্মদ আলি শাহ-কে মসনদে
বসাতে উদগ্রীব। কারণ কী? ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল সাফ জানিয়ে
দিয়েছেন, উত্তরাধিকারীর জন্ম নিয়ে যখন ধোঁয়াশা, তখন সেই উত্তরাধিকারীকে পত্রপাঠ
খারিজ করে দিতে হবে। অবধের রেসিডেন্ট তাই করলেন। মুন্না জান আর তা দাদি পাদশা
বেগমের ঠাঁই হল চুনার জেলে। মুন্না জানের মা আফজল মহলকেও সেখানে পাঠানো হল। নতুন
রাজা হলেন মুহাম্মদ আলি শাহ। তিনি বৃদ্ধ মানুষ। সিংহাসনে বসার আগেই ইংরেজদের দাসখত
লিখে দিলেন। তবে কিছু কাজও করে যান তিনি। পুকুর আর কূপ খনন, মুসাফিরখানা,
ইমামবাড়া, হোসেনাবাদ, জামা মসজিদ এবং আরও কিছু ইমারত ও উদ্যান তৈরি করেন তিনি। এর
মধ্যে হোসেনাবাদ খুব বিখ্যাত, যাকে ছোট ইমামবাড়াও বলা হয়। লখনউয়ে বড় ইমামবাড়া
বানিয়েছিলেন আসফ-উদ-দৌলা আর ছোট ইমামবাড়া বানালেন নাসিরউদ্দিন। এটি দেখতে তাজমহলের
মতো কিন্তু আকারে ছোট। নাসিরউদ্দিনের সময়ে লখনউকে বলা হত ভারতের ব্যবিলন। মোট পাঁচ
বছর রাজত্ব করে মারা যান তিনি। রাজা হলেন মুহাম্মদ আলি শাহ-র দ্বিতীয় পুত্র আমজাদ
আলি শাহ। ইনি ওয়াজেদ আলি শাহ-র পিতা।
মুহাম্মদ আলি শাহ আমজাদ আলির
লেখাপড়া নিয়ে খুব সতর্ক ছিলেন। মুহাম্মদ আলি বুঝেছিলেন, সঠিক শিক্ষা ছাড়া একজন
রাজা ঠিকমতো শাসন করতে পারেন না। মুর্খ রাজার চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু নেই প্রজাদের
কাছে। অনেক শিক্ষক ছিল তাঁর, সাবেকি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাও পেলেন আমজাদ
আলি। তিনি তখন যুবরাজ। কিন্তু আমজাদের ঝোঁক ছিল ধর্মীয় শিক্ষার দিকে। তিনি
ধর্মতত্ত্ব পড়লেন ভাল করে। অবধের নবাব-রাজাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি ধর্মপরায়ণ
রাজা ছিলেন। হজরতগঞ্জে সিবতায়নবাদ ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠা করেন আমজাদ আলি শাহ। রাজা
নিজে একজন সাচ্চা মৌলবি, নিষ্ঠাবান শিয়া এবং শিয়া ধর্মগুরুদের কঠোর নীতিনিয়মের
অনুগামী। সপ্তম শিয়া ইমাম মুসা ইবনে জাফর যে তাঁর উর্ধ্বতন পুরুষ ছিলেন তা আমজাদ
আলিকে দেখলে মানুষ বুঝতে পারেন। তিনি জাকাতের অর্থ নির্বিচারে বিলি করতেন না,
তাঁদেরই দিতেন যাঁরা এর প্রকৃত দাবিদার। আমজাদ আলি শাহ-র মৃত্যু হয় ক্যানসারে।
কিন্তু তাঁর প্রধান বেগম মনে করতেন, দুরারোগ্য ক্ষত থেকে তিনি মারা যাননি, বিষ
প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে রাজাকে। তবে কেউ কেউ বলেন, অনুপশমনীয় ব্যাধির যন্ত্রণা
সহ্য করতে না পেরে তিনিই হেকিমকে বিষপ্রয়োগ করতে অনুরোধ করেন। মৃত্যুশয্যায় আমজাদ আলি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন,
তাঁর পুত্রের শাসনে অবধ কখনই সমৃদ্ধিলাভ করবে না।
আমাজদের পর কে হবেন মসনদের
উত্তরাধিকারী? কানাঘুষো শোনা যায়, তাঁর সবচেয়ে বড় পুত্র একজন আছেন, কিন্তু তিনি
প্রতিবন্ধী; চলাফেরা করতে পারেন না।। শারীরিক খুঁত নিয়ে রাজা হওয়া যায় না। এ ছাড়া আর এক
পুত্র আছে মুস্তাফা আলি খান, বিবাহজাত সন্তান নয়। সে আমজাদের প্রথম বিয়ের আগের
সন্তান, তা ছাড়া তার মা দাসী। দাসীপুত্র মন্ত্রী বা অন্য কোনও পদ পেতে পারে,
কিন্তু রাজা হতে পারে না।অবশ্য কয়েক দিন পরে সে মারা যায়। এর পর তিন
রাজকুমার--ওয়াজিদ আলি, দারা সাতওয়াত, সোলেমান কদর। মৃত্যুর আগেই আমজাদ আলি শাহ
ওয়াজেদ আলিকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে গিয়েছেন। সেই সময় আমজাদ এক সবজিওয়ালার
কন্যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। মধ্যবয়সের প্রেম। সেই মহব্বত নিকাহ পর্যন্ত গড়ায়।
সবজিওয়ালির নাম হয় সুলতান মহল। এর কয়েক দিন পর আমজাদের মৃত্যু। ভারতের স্বাধীনতা
লাভের ঠিক এক শত বছর আগে অবধের রাজা হন ওয়াজেদ আলি শাহ। তখন তাঁর বয়স পঁচিশ বছর।
ওয়াজেদ আলি শাহ-র মা আমজাদ আলির প্রথম স্ত্রী মালিকা কিশবার, পরে যিনি হন
জনাব-এ-আলিয়া।
এই সব কাহিনি এলু জানের প্রপৌত্রী নীলু জান মেটিয়াবুরজের সিবতায়নাবাদে বসে বলেছিলেন। চিরকুমার নায়ের কদর
সেখানে মহরমের মাতমের আয়োজন করছিলেন। নীলুজানের বড়আম্মা অর্থাৎ
ঠাকুর্দার মা ছিলেন এলু জান। এলু শৈশব থেকে নবাব পরিবারের বাসিন্দা। সে
ওয়াজেদ-জননীর তামাক সাজাতো আর পা টিপে দিত। এক কথায়, সে ছিল ওয়াজেদ আলি শাহ-র মা
আওলিয়া বেগমের খাস পরিচারিকা। নায়ের কদর হলেন ওয়াজেদ আলির প্রপৌত্র। ওয়াজেদ আলি
শাহ-র অন্যতম পুত্র ব্রিজিস কদর, তাঁর পুত্র মেহের কদর, মেহেরের কনিষ্ঠ পুত্র হলেন
চিরকুমার নায়ের কাদের। নায়ের সিবতায়নাবাদ ইমামবাড়ায় স্বাধীন ভারতের পতাকা তোলেন।
ইংরেজদের হাত থেকে আজাদি পাওয়ার পরও সাতাশ বছর ধরে ইমামবাড়ায় ব্রিটিশ পতাকা উঠেছে।
চিরকুমার নায়ের কাদের সেই পতাকা নামিয়ে আজাদ ভারতের নিশানা তুলেছিলেন। তিন
ওয়াজেদের প্রপৌত্র।
নীলুজান
বললেন, আমজাদপুত্র ওয়াজেদ তাঁর তিন ভ্রাতার সঙ্গে ফারহাত বখশ-এ খেলা করছিলেন। এই
ফারহাত বখশ প্রাসাদ বানিয়েছিলেন ফরাসী ক্লড মার্টিন। তাঁর গুণপনা সময় হলে বিবৃত
করব।ক্রীড়ারত ওয়াজেদ ভাইদের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক দরবেশ। তিনি কী ভাবে প্রাসাদের
অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন, তা অবশ্য জানা যায় না। অসুস্থ মুস্তাফা আলি দূরে চুপচাপ
বসেছিল। দরবেশ তাকে দেখেই বলে দিলেন, এই রাজপুত্রের দিন ঘনিয়ে এসেছে। খুব শীঘ্রই এ মারা
যাবে। তার পর ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ছেলে সাধু হয়ে যাবে! ইতিমধ্যে সেখানে
পরিচারিকারা এসে ভীড় জমিয়েছে। তারা রাজপুত্রদের ভেতরে নিয়ে চলে যেতে চায়। দরবেশকে
খুব চেনা চেনা লাগে! কিন্তু দাড়িগোঁফের জঙ্গল থেকে তাঁর আসল মুখখানা কেউ বের করে
দেখতে পারে না। দরবেশকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রাসাদের খাস মহলে, সেখানে রাণী
জনাব-এ-আলিয়া মালিকা কিশবর দরবেশকে বসতে বললেন। পর্দার আড়াল থেকে জনাব-এ-আলিয়া
প্রশ্ন করলেন, আমারওয়াজেদ আলি যোগী হয়ে যাবে? এ কথা তো আমি মেনে নেব ভেবেছেন?
দরবেশ হাসলেন। জবাব দিলেন, সে
আপনার খুশি। মানতেও পারেন, আবার ছুঁড়ে ফেলেও দিতে পারেন। তবে ওর কপালে যোগীরেখা
স্পষ্ট দেখা যায়।
জনাব-এ-আলিয়া পুনরায় দরবেশকে
প্রশ্ন করলেন, এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না?
দরবেশ বললেন, এই রাজপুত্রকে
কিছু সময়ের জন্য আমার সঙ্গে যেতে দিন। মাত্র দু তিন ঘন্টা। বেগম আমতা আমতা করে
সম্মত হলেন। ওয়াজেদ দরবেশের সঙ্গে যেতে যেতে পথে এক নাসারা সন্ন্যাসীকে দেখলেন। সে
মাঝেমধ্যে অদৃশ্য হচ্ছে। ওয়াজেদ আলিকে দরবেশ বললেন, যাও ওই জলাশয়ে ওজু করে এসো,
তার পর আমার সঙ্গে নমাজ পড়ো। ওয়াজেদ মাথার পাগড়ি খুলে জলাশয়ে মুখমণ্ডল, হস্তপদাদি
প্রক্ষালন শুরু করলে নাসারা সন্ন্যাসী তার পাগড়ি নিয়ে পালায়। ওজু শেষ করে ওয়াজেদ
সেই সন্নাসীকে ধরে ফেলে। সে তখন টিকটিকির রূপ ধারণ করে সহসা আবির্ভূত এক গর্তে
প্রবেশ করে গায়েবলোকে চলে গেল। ওয়াজেদ আলি সেই গর্ত দণ্ডকাষ্ঠ দিয়ে খুঁড়ে বর করার
চেষ্টা করলেন। তাঁকে ক্লান্ত ও অকৃতকার্য দেখে দরবেশ তাঁর কাঁধের উত্তরীয়কে বললেন,
যাও, ওই বালরাজাকে সাহায্য করো। উত্তরীয় কঠোর হয়ে দণ্ডকাষ্ঠে অধিষ্ঠিত হয়ে সেই
গর্ত বড় করে দিল। ওয়াজেদ আলি সেই গর্ত দিয়ে গায়েবলোকে গেলেন এবং সেখানে নানাবিধ
প্রাসাদ, ইমামবাড়া, হর্ম্য ক্রীড়াস্থানাদি দেখতে পেলেন। কুণ্ডল ফিরে পাবার জন্য
তিনি গায়েব-উল-আলমের স্তব করতে লাগলেন। তার পর দেখলেন, দুই জন লোক মারামারি করছে,
তাদের পরস্পরের রক্তের রঙই লাল। মারামারি মাঝেমধ্যে থামিয়ে তারা নিজ নিজ চক্র
ঘোরাচ্ছে। এক জনের চক্র পাঁচটি পাখিযুক্ত, অন্যজনের সাতটি। একজন সুদর্শন পুরুষের
ছায়া দেখতে পান ওয়াজেদ আলি, তাঁর সামনে একটি খচরের মতো এক জীব, যা ঘোড়ার চেয়ে
কিঞ্চিৎ ছোট আর গাধার চেয়ে কিঞ্চিৎ বড়। ওয়াজেদ এই সব সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করলেন।
সেই সুদর্শন পুরুষের ছায়া তাকে বললেন, তোমার আগমনে আমি প্রসন্ন হয়েছি, কী অভীষ্ট
সাধন করব বল। ওয়াজেদ বললেন, গায়েবলোক আমার বশীভূত হোক! পুরুষ বললেন, তুমি ওই খচরের
গুহ্যদেশে ফুৎকার দাও। ওয়াজেদ ফুৎকার দিলে খচরের সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার থেকে
বহ্নিবিশিষ্ট ধূম নির্গত হয়ে গায়েবলোকে ব্যাপ্ত হল। তখন ভীত হয়ে টিকটিকি অর্থাৎ
সেই নাসারা সন্ন্যাসী তার বাসভবন থেকে বেরিয়ে এসে বল, এই নাও তোমার পাগড়ি। পাগড়ি
পেয়ে ওয়াজেদ আলি শাহ ভাবলেন, তাঁর না-ফেরা পর্যন্ত মাতা জনাব-এ-আলিয়া ইফতারের সময়
হয়ে গেলেও কিছু মুখে তুলবেন না। আজ তাঁর নফল রোজা রাখার দিন। সুদর্শন পুরুষ বললেন,
তুমি এই খচরের পিঠে চাপো, কয়েক মুহূর্তে প্রাসাদে পৌঁছে যাবে।
মাতা জনাব-এ-আলিয়া ওজু করে
চুপচাপ বসে আছেন। এমন সময় বালক ওয়াজেদ সেখানে পৌঁছলেন। মাকে সালাম করে সব বৃত্তান্ত
জানালেন। জনাব-এ-আলিয়া বললেন, যে দুই জন লোককে মারামারি করতে দেখেছ, তারা হল শিয়া
আর সুন্নি। তাদের উভয়ের খুন লাল। সুন্নির চক্রে পাঁচটা পাখি, তার মানে হল কলমা,
নমাজ, রোজা, হজ আর জাকাত। কলমা হল খোদা আর তার রসুলে বিশ্বাস স্থাপন। নমাজ হল,
দিনে পাঁচ বার প্রার্থনা, রোজা মানে এক মাস সুর্যোদয়ের পূর্ব থেকে সুর্যাস্ত
পর্যন্ত নিরম্বু উপবাস। কাবাঘর প্রদক্ষিণ করা হল হজব্রত। জাকাত হল, সঞ্চিত অর্থের
একটি অংশ গরিব-মিসকিনদের বিলি করে দেওয়া। শিয়ার চক্রে সাতটা পাখি—ওয়ালায়াহ,
তাহারাহ, নমাজ, রোজা, হজ, জাকাত আর জিহাদ। ওয়ালায়াহা হল অভিভাবকত্ব যা খোদা, নবি,
ইমাম, কুরআন এর প্রতি প্রেম ও নিবিড়তাকে বোঝায়। তাহারাহ হল বিশুদ্ধতা--মন, আত্মা ও
কর্মের বিশুদ্ধতা। জিহাদ হল সংগ্রাম—বড় অর্থে নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ, ছোট অর্থে
নিজের সঙ্গে শত্রুর যুদ্ধ। আর যেসুদর্শন পুরুষের ছায়া দেখেছ, তিনি হলেন ইমাম হোসেন। আর ওই
না-অশ্ব খচর হল তাঁর নানার বাহন, যাতে চড়ে তিনি গায়েবলোকে ভ্রমণ করেছিলেন।
ওয়াজেদ আলি নাসারা সন্ন্যাসীর
উপর প্রতিশোধ নেবার সংকল্প করে অবধের রাজা, তাঁর পিতামহমুহাম্মদ আলি শাহ-র কাছে
গেলেন। মুহাম্মদ আলি তখন মসজিদ থেকে ফিরে এসেছেন, মন্ত্রীরা তাঁকে ঘিরে আছেন।
ওয়াজেদ পিতামহকে বললেন, মহারাজ, যে কার্য করা উচিত ছিল তা না করে আপনি বালকের
ন্যায় অন্য কার্য করছেন। মুহাম্মদ আলি তাঁকে বললেন, আমি ধার্মিক শিয়া মুসলমান,
আমার ধর্ম অনুসারে প্রজাপালন করে থাকি, তুমি আমাকে কী করতে বলো? ওয়াজেদ বললেন,
আপনার রাজ্য যার চক্রান্তে আজ অর্ধেক হয়ে গেছে, সেই দুরাত্মা নাসারাদের উপর
প্রতিশোধ নিন। আমি এক দরবেশের সঙ্গে আমার যোগিয়া-ফাঁড়া কাটানোর জন্য সাধনপথে
ঘুরছিলাম, তখন ওই নাসারা সন্ন্যাসী আমার বিঘ্ন করেছিল। ওয়াজেদের কথা শুনে রাজা মুহাম্মদ
আলি নাসারা-টিকটিকির উপর অতিশয় ক্রুদ্ধ হলেন এবং শোকার্তমনে মন্ত্রীদের ওয়াজেদের
ভবিষ্যত বিষয় জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন।
রাজা নাসিরউদ্দিন হায়দারের
সময়কালের এক বৃদ্ধ জ্যোতিষী তখনও বেঁচেছিলেন। তিনি বাস করতেন তারা কোঠিতে। তাঁকে
আহ্বান করা হলে তিনি জানান, রাজকুমার ওয়াজেদ আলির সত্যই সন্ন্যাসযোগ আছে। তবে এর
থেকে মুক্তি পাওয়াও সম্ভব। তাছাড়া ওয়াজেদ আলি গায়েবলোক থেকে ঘুরে এসেছেন। ওয়াজেদের
প্রত্যেক জন্মদিনে তাঁকে গেরুয়া পোশাক পরে সন্ন্যাসীর ধর্ম ও ব্রত পালন করতে হবে।
নিষ্ঠাভরে তিনি যদি এই নিদান অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন, তবে সন্ন্যাসযোগ নষ্ট হবে।
কিন্তু ভুলক্রমেও যদি ব্রতপালনে বিঘ্ন ঘটে তবে অনর্থ হবে। আর পাঁচ দিন পর
রাজকুমারের জন্মদিন। ওই দিন এই সাজসজ্জা করলে গ্রহনক্ষত্রের দোষ কেটে যাবে। অতএব,
ব্রতপালনের সমস্ত ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিন মহারাজ।
নির্দিষ্ট দিনে বালক ওয়াজেদ আলি
গেরুয়া আলখাল্লা পরে, সারা শরীরে ও মুখমণ্ডলে ছাই মেখে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা
পরে, হাতে জপমালা নিয়ে দুই যোগিনীকে নিয়ে প্রাসাদে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ধীরে ধীরে
ওয়াজেদের জন্মদিনে ‘যোগিয়া জশন’ নামে একটি মেলা বসতে লাগল লখনউ-য়।
জাতিধর্ম-নির্বিশেষে লখনউয়ের সব নাগরিক ওয়াজেদের মতো যোগী সেজে সেই মেলায় আসতে
লাগলেন। কাইজারবাগে রাসলীলার জন্য একটি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করা হল। সেখানে কবিতা
পাঠ, গীতিনাট্য আর কথক নৃত্যের নিয়মিত আসর বসতে লাগল। নর্তকীদের আগমনে কায়জারবাগ
মুখরিত হয়ে উঠল। প্রমোদ কুঠিতে যে সব রমণী থাকতেন তাঁরা যেমন যোগিনী সাজার জন্য
উৎফুল্ল হয়ে আসতে লাগলেন তেমনি সমকামী প্রমোদ-পুরুষরাও চলে এলেন যোগিয়া মেলায়। এ
যেন এক নতুন লখনউ। ধার্মিক রাজা মুহাম্মদ আলি শাহ ওযুবরাজ আমজাদ আলি পৌত্র ও পুত্রের
মঙ্গলের জন্য সব কিছুই মেনে নিলেন।
ওয়াজেদ আলি তখন নিতান্তই বালক।



No comments:
Post a Comment