রোহণ ভট্টাচার্য

ক্রিকেটগলি

শিল্পীঃ সম্বিত বসু 


কথায় আছে, অপেক্ষায় বাড়ে প্রেম তাহলে অপেক্ষার গল্প দিয়েই শুরু করা যাক তখন বর্ষাকাল শেষ হয়ে আসছে শহরতলির রাস্তা এমনভাবে ভেসে উঠছে, যেন অনেকদিন জলের তলায় ডুবে থাকা কোনো সাম্রাজ্য দুপুরের ব্যালকনি থেকে এখন স্পষ্ট দেখা যায় চাকার দাগের কাটাকুটি খেলা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে সাপলুডোর সবচেয়ে বড় দুই সাপের মতো অভিশাপের মতনও বটে নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছে যাওয়া কোনো ঘুটিকে মাত্র এক অঙ্কের জন্য গিলে ফেলা সাপ আমাদের বাড়ির সামনে সমস্ত বৃষ্টিদিন জুড়ে এলিয়ে আছে কিছুতেই শুকোচ্ছে না খেলতে নামার সমস্ত ইচ্ছেকে গিলে নিচ্ছে রোদের থেকে এক অঙ্ক আগে আর আমরা খুঁজে চলেছি সেই মই, যার মাথায় চড়ে মেঘগুলোকে একটু ঠেলে গ্যালারির বাইরে সরিয়ে দেওয়া যেত

বৃষ্টিতে একহাঁটু জল জমে এখানে জলের বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা আমাদের বাড়ি ছাদে দাঁড়ালে মনে হয় কলকাতা নয়, দ্বীপান্তরে আছি দূরে ম্যানহোল খোলা বাচ্চাদের ভাসানো কাগজের নৌকা ঘূর্ণি হয়ে হারিয়ে যায় শহরতলির বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে বহুজন্ম আগের একটা ছড়া মনে পড়েরেইন রেইন গো অ্যাওয়ে/ কাম এগেইন এনাদার ডে/ লিটল জনি ওয়ান্টস টু প্লে ক্রিকেটের আর বৃষ্টির চিরকালীন টানাপোড়েন যেখানে শেষ হয়, সেইখান থেকে শুরু হয় এই গল্প

বেশ মনে আছে, স্কুল থেকে ফিরে ইউনফর্ম খোলারও সময় থাকত না আমাদের স্কুলের সাদা জামা পরেই বাড়িতে না এসে পাশের গলিতে ঢুকে যেতাম যাওয়ার পথে সমস্ত বাড়িতে হাঁক দিতামবন্ধুদের কিছুক্ষণের মধ্যে সারাদুপুরের গোবেচারা গলি দামাল হয়ে উঠত বিকেলে দু-একটা কাঁচ ভাঙার শব্দ, আউটের জন্য একসঙ্গে চিৎকার, কিংবা আউট হয়েছে কিনা সেই নিয়ে কোনোদিন শেষ না হওয়া তর্ক এখনও তাই বর্ষাকাল এলে সেই অপেক্ষা ফিরে আসে কোথাও একটা বিশ্বাস কাজ করে, খেলা শুরু হলে আবার বয়স কমে যাবে হয়ত

যেদিন আকাশভাঙা শেষ হল, পাতা হল গেরুয়া ইঁট ধুলো ঝেড়ে ফিরে এলো ব্যাট এলো নতুন বল গলিও জানল তার জন্ম শুধুমাত্র হলুদ ল্যাম্পপোস্টের নিচে, মানুষের শর্টকাট ম্যাপ হয়ে থাকার জন্য হয়নি এখনও তার বুকের বাঁদিকে বল পড়লে অফস্পিন হয়, ডানদিকে পড়লে লেগস্পিন যতই কর্পোরেশানের লোক এসে শরীর খুঁড়ে পাইপ ভরে দিয়ে যাক না কেন

কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ছুটির দিনের জন্য অপেক্ষা করি আজকাল আগেরদিন ফোনে ফোনে খবর পৌঁছে যায় কাল খেলা পথচলতি দু-একজন আড়চোখে দেখে নেয় আমাদের যে বয়সে মধ্যবিত্ত বাঙালী ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের কথা ভাবে, সেই বয়সে আমরা কয়েকটা উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে সকাল সকাল ব্যাক ফুটে খেললে ব্যালেন্স কেমন হবে এই নিয়ে পড়ে আছি দোতলা-তিনতলার কাকিমারা ভ্রূ কোঁচকায় বাড়িতে ফোন আসে, “তোমার ছেলের চাকরিটা আছে তো?”

গলির পাশে মুদির দোকান দোকানের চালে বারবার বল পড়ে এমন মুখ করে দোকানি বেরিয়ে আসেন যেন এইমাত্র আলুর দাম বেড়ে গিয়েছে বাউন্ডারির শেষে যে বাড়ি, সেখানে আছেন বিবাহযোগ্যা কন্যা ওখানে কেউ ফিল্ডিং করলেই তার সন্দেহপ্রবণ বাপ বেরিয়ে এসে পায়চারি শুরু করেন চোখেমুখে দুশ্চিন্তাপাড়ার ছেলেদের কাছে মেয়ের আস্কিংরেট বেড়ে গেল নাকি? বিড়বিড় করেন মনে হবে গায়েত্রী মন্ত্র, পাছে পাপ ঢুকে পড়ে জামাই সেজে একটু ভালো করে শুনলে বোঝা যায় আমাদের শাপ-শাপান্ত করছেন পাড়ার দুঁদে প্রোমোটার, যার ধারণা এই গলি তার প্রপিতামহের খুড়তুতো শ্যালকের; সে এসে দুবেলা খেলা বন্ধের হুমকি দিয়ে যায়

তবু বন্ধ হয়নি বরং একটু পালটে ফেলা হয়েছে নিয়মকানুন ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে জনগণের স্বার্থে ব্যাট করার সময় ব্যাটে লেগে ফুলটসে কোনো দেওয়ালে, পাঁচিলে, গাছে লাগলেই আউট এই অদ্ভুত খেলা যখন শুরু করেছিলাম তখন লোক ছিল কম মারপিটহীন অহিংস খেলা এই টি-টোয়েন্টি আমলে কেই বা খেলতে চায়! ছয়-চার নেই আক্রমণ করা নেই শুধু নিজের দিকে বল এলে তাকে মাটিতে নামিয়ে দেওয়া ড্রপ খেয়ে বা গড়িয়ে দেওয়ালে লাগলে এক রান আর সামনে সোজা মারলে দুই কৈশোরের ক্রিকেটের সাথে পার্থক্য একটাই আগে সব বল আকাশে মারার কথা ভাবতাম, এখন বলকে মাটিতে রাখার কথা ভাবি, বাইরে যাওয়া বলকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবি যেন, যা দূরে আছে তার জন্য ঝাঁপানোর থেকে, যেআছে কাছেতাকেই আরো বেশি করে আগলানো আগে পাড়ার দাদাগোছের কেউ খেলা বন্ধ করতে বললে পাল্টা দিতে তেড়ে যেতাম এখন শুধু চুপ করে থাকি অফিসের ফোন এলে সাইলেন্ট করে দিই, ব্যাটের গ্রিপে মুঠোটা একটু শক্ত হয় শুধু আগে যে জায়গায় বল পড়লে তাকে মেঘপিয়নের দেশে পাঠাবার কথা ভাবতাম, এখন সেই জায়গায় বল পড়লে নিজেকে সংযত রাখতে হয় ভাবতে হয় ফ্রণ্টফুট না ব্যাকফুট? ছাড়ব না খেলব? আসলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মতো আমাদের ক্রিকেটকে দেখাও বদলে গিয়েছে হয়ত কিংবা ক্রিকেটই আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে টিকে থাকার জন্য রক্ষণ জরুরি

এখন সময় কেটেছে আস্তে আস্তে বেড়েছে লোক কেউ পাড়ার, কেউ অন্য পাড়ার, কেউ কেউ অন্য জায়গার আমাদের অহিংস আন্দোলন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে বছর ঘুরতেই আসলে ছয়-চার না মেরে শুধু আউট না হওয়ার জন্য খেলে যাওয়াটা মনে হয় মানুষের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা অস্তিত্বের লড়াইকে কোনোভাবে খোঁচা মারে গলিতে বেড়ে যায় ক্রিকেট খেলার লোক কয়েকজন প্রতিবেশি খেলা দেখতে দাঁড়িয়ে পড়ে কার্নিশের নিচে আর আমরা শান্ত থেকে আরো শান্ত হওয়ার খেলা খেলি

প্রত্যেকটা বল লড়াই মাটিতে গোঁত্তা মেরে পাঁজর বরাবর ছিটকে আসা বলের সামনে বারবার একা হয়ে যাওয়ামানুষ যে নিজেকে ঠিক কতটা ভালোবাসে তা বোঝার জন্য অন্তত একবার ব্যাটসম্যানের জীবন কাটানো উচিত সামান্য একটু কানায় লাগলে বা ব্যাটের মুখ একচিলতে ঘুরে গেলেই দেওয়ালে লেগে যেতে পারে তারমধ্যে সামনে দুজন ফিল্ডার নামাতে গিয়েও ক্যাচ হতে পারে একটা নিরীহ ডেলিভারিতেও জীবন চলে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে এইরকম খেলায় প্রতিদিন লোক বাড়তে দেখলে সত্যিই গর্ব হয় হতে পারে গলিক্রিকেট কিন্তু এই ছিন্নভিন্ন সময়ে দাঁড়িয়েও হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা কোনো বলকে ব্যাটের মাঝখান দিয়ে শান্ত করতে দেখলে মনে হয়, প্রতিরোধ করার মতো চকচকে একটা মন মানুষের মধ্যে এখনও রয়েগেছে


এই পাড়ায় খেলাটা এখন ভাইরাল হয়ে গেছে কোনো এক মধ্যবিত্ততায় আটকে যারা একসময় মাঠে যাওয়া ছেড়েছিল, জোর গলায় বলতে পারেনি আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই না, খেলতে চাই কিংবা যারা আদতে এইসব ভাবেওনি শুধু কোনো একদিন খেলা দেখতে দেখতেই বুঝতে পেরেছিল তার জীবনে এই খেলার কিছুটা ঋণ আছে হয়তবা তারা ভীড় জমাচ্ছে গলিতে সকাল এগারোটা বাজলেই পরপর সাইকেল এসে জমা হচ্ছে ফুটপাথে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে ব্যাট দোতলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ক্যাম্বিস বল সব বাড়ির তলায় হাঁকডাক চলছে প্রতিদিন


আমাদের কেয়ারটেকার রাজাদা প্রতিদিন এসে আগে ইঁট পাতে লাল সুরকি দিয়ে ক্রিজ টানে তারপর সব বাড়ির দেওয়ালে বল মেরে মেরে ডাকে লোকজনকে আবার খেলা শেষ হলে ব্যাটে বল নাচাতে নাচাতে ঢুকে যায় সিঁড়ির তলার ছোট্ট ঘরটায় সকালে টিউশান পড়িয়ে সবার আগে চলে আসে দেবা এসে কিছুই করে না শুধু চেনা-অচেনা সব মানুষকে একবার করে জিগেস করেদাদা আজ খেলবে নাকি?” আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সমানে দুলে চলে পেণ্ডুলামের মতো কী বলতে চায় ? সময় চলে যাচ্ছে? আবার আরেকটা বর্ষাকাল ফিরে আসবে?

একদিন খেলা সবে শুরু করেছি কোথা থেকে যেন একখানাদেমাকি বাইক এসে থামল হলিউডের খেতে না পাওয়া ভিলেনের মতো দেখতে একজন লোক নামল অনেক্ষণ দাঁড়িয়েমানুষের অসুবিধেআমাকে চেনো নাখেলা বন্ধ করে দেবোরাস্তাটা খেলার জায়গা না…” এরকম আরো কতকিছু বলেছিল পরে জেনেছিলাম পাড়াতুতো প্রোমোটার গুণ্ডা-পুলিশ-নেতা সবারই দূর সম্পর্কের আত্মীয় রাগ-মনখারাপ-অভিমান সবই হয়েছিল কোনো প্রতিবাদ না করে চুপ করে ছিলাম আমরা এরমধ্যে রাজাদা, যে কিনা একটু ঝগড়া করতে পারে, সেওমেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছিবলে সাইকেল নিয়ে গলির বাঁকে উধাও হয়ে গেল ফিরে এসে সেদিন একটাও বল আর গা দিয়ে, মাথা দিয়ে খেলেনি রাজাদা উল্টোপাল্টা খোঁচাও মারেনি সোজা ব্যাটে খেলে দশ রান করেছিল এই গলিতে যেখানে যখন তখন খানাখন্দে পড়ে বল লাফায়, নিচু হয়, আস্তে হয়, জোরে হয় একপিচে দেওয়ালে লাগলে আউট গলির প্রাচীন প্রবাদ বলে, “এখানে একটি রান দশটি রানের সমান সেদিন সাইকেল চালাতে চালাতে নিজেকে কী বুঝিয়েছিল রাজাদা? বাবা হিসেবে অনেক দায়িত্ব তোমার সবসময় আক্রমণে যেও না মেয়েকে ঘরে নিয়ে ফিরতে হবে মনে রাখবে তোমার পরে পরিবারে রান তোলার লোক কম অতএব, ব্যাট যেন সোজা থাকে দেওয়ালের দিকে খেলো না এইসব?

প্রোমোটারবাবু, আপনি গলাবাজি করে, পার্টিবাজি করে গলি কেড়ে নিতে পারেন কিন্তু ক্রিকেট কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কোথায় আপনার? আপনার তো নাগরিকত্বেও রাজনৈতিক দলের রঙ মাখানো আপনার দেশ নেই, রাষ্ট্র আছে বসবাসের জন্য মাত্র কয়েকহাজার স্কোয়ারফিট ফ্ল্যাট কিন্তু বিশ্বাস করুন আমাদের কিন্তু আস্ত গ্রহ আছে একটা গ্রহের রঙ বাদামী মাঝখানে বিষুবরেখার মতো সাদা সুতোর সেলাই সেখানে আমরা শচীনকে রক্ত মুছে অফড্রাইভ মারতে দেখেছি, আমরা যুবরাজকে বমি করতে করতে রান নিতে দেখেছি, আমরা কুম্বলেকে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বেঁধে বোলিং করতে দেখেছি সেই গ্রহের সমস্ত গলি একে অপরকে ছুঁয়ে আছে কান আছে সমস্ত দেওয়ালের, পাঁচিলের আমরা শুধু সংক্রমণটা ছড়িয়ে দিলাম, সমস্ত গলির উদ্দেশ্যে

ক্রিকেটগলি, রাস্তার ইতিহাসে কখনওই রাজপথ নয় বরং শ্রমিকপথ, প্রজাপথ এখানে পাঁচিলের ফাঁকা দিয়ে বাড়ির ভিতরের বাড়িকে দেখা যায় এখানে ক্রিকেটের ফাঁক দিয়ে রোজদিনের বেঁচে থাকাকে দেখা যায় এখানকার কোনো মানচিত্র নেই, তবু বাড়ির গায়ে গায়ে ঠিকানা লেখা লেটারবক্স আছে দমকা হাওয়া আর সপাটে এসে লাগা বলের ধাক্কায় নড়ে ওঠে মাঝেমধ্যে তারপর আবার শান্ত হয়ে যায় সাধারণ জীবনকে আরো ধৈর্যশীল হতে বলে কখনও হাল না ছাড়তে বলে বলে ভরসা রাখো বৃষ্টি থামবে, রোদ উঠবে শুধু পরেরবার থেকে বর্ষাকালে, মনে মনে স্যার রিচি বেনোকে ডেকো ওঁর স্বর দৈববাণী প্রার্থনা কোরো, যেন ওই সাদা মেঘের ভিতর থেকে একবার উনি বলে ওঠেনদ্য প্লে হ্যাস নট স্টপটড ডিউ টু রেইন

No comments:

Post a Comment

গল্প গাছা

ধারাবাহিক উপন্যাস

ধারাবাহিক অনুবাদ

বাইশ গজের খাতা

Powered by Blogger.

Total Pageviews

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

লেখা পাঠাবার ঠিকানা

আপনাদের ছোটো বা বড় গল্প পাঠান । বিশেষ করে সেই লেখাটি যা কেউ পড়বেনা ভেবে পাঠাননি আগে কোথাও। লেখা পাঠাবার ঠিকানা-mackerelblogzine@gmail.com

*[ লেখা বেছে নেবার ক্ষেত্রে সম্পাদকের রায় চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে । ]

Copyright © ম্যাকারেল | Powered by Blogger
Design by SimpleWpThemes | Blogger Theme by NewBloggerThemes.com | Distributed By Blogger Templates20