চেরনোবিলের কণ্ঠস্বর: একটি পারমাণবিক দূর্ঘটনার কথ্য ইতিহাস
স্ভেৎলানা আলেস্কেইভিচ
নি:শব্দ গানের বিষয়ে
সংলাপ
আমি হাঁটু মুড়ে বসব তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে- দয়া করে আমাদের
আন্না সুশকোকে খুঁজে দাও। সে আমাদের গ্রামে বাস করতো। কোজুহুশকি গ্রামে। আমি তোমাদের
বলবো সে দেখতে কেমন ছিল আর তোমরা সেটা টাইপ করে নিও। ওর কুঁজ ছিল আর জন্ম থেকেই ও বোবা।
সে নিজের মত করে বাঁচত। তার বয়স হয়েছিল ষাটের মত। চেরনোবিলের বিষ্ফোরণের পর আমাদের
সবাইকে যখন তল্লাট ছাড়তে হয়, তখন কর্তৃপক্ষ তাকে একটি এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে অন্য কোথাও
নিয়ে যায়। ও ত’ পড়তে শেখে নি। কাজেই আমরা ওর কাছ থেকে কোন চিঠিও আর পাইনি। একাকী এবং
অসুস্থ মানুষদের বিশেষ বিশেষ জায়গায় রাখা হতো। কর্তৃপক্ষ তাদের লুকিয়ে রাখতো। কেউ জানেনি
কোথায়। এটা লিখে রাখো।...
গোটা গ্রাম তার যত্ন নিত, যেন সে ছিল একটি ছোট মেয়ে। কেউ তার জন্য কাঠ কেটে
আনবে, কেউ তাকে দুধ এনে দেবে। কেউ তার ঘরে সন্ধ্যা বেলায় একটি ঘন্টা কাটাবে আর তার
উনুন ধরিয়ে দেবে। দু’টো বছর আমরা অন্য নানা জায়গায় কাটিয়ে পরে আবার ঘরে ফিরলাম। বোবা
আর কুঁজো আন্নার সাথে দেখা হলে বলো যে আমরা ওর পড়শিরা আবার আমাদের গ্রামে ফিরেছি। আর
তার বাড়িটাও আজো আছে।
আন্নাকে বলো তার বাড়ির ছাদটি একইরকম আছে, জানালাগুলোও। যা কিছু ভেঙ্গে-চুরে গ্যাছে বা চুরি
হয়েছে, আমরা তার সবকিছুই মেরামত করতে পারব। তুমি ত’ সাংবাদিক- একবার যদি আমাদের জানাতে
পারো যে কর্তৃপক্ষ আন্নাকে কোথায় রেখেছে, কোথায় সে একা একা বাস করছে আর কষ্ট পাচ্ছে,
তাহলে আমরাই ওর ঠিকানায় গিয়ে ওকে নিয়ে আসব। যাতে সে দু:খে না মরে যায়। তোমার কাছে এই
দয়া ভিক্ষে চাই আমরা। না জানি অচেনা মানুষের ভিড়ে নিরীহ, নিষ্পাপ আন্না কত কষ্ট পাচ্ছে।
তার বিষয়ে আর একটি কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। কোন বিষয়ে কষ্ট পেলে
আন্না গান গায়। ও ত’ কথা বলতে পারে না। তাই ওর গানে কোন শব্দ নেই। শুধুই গলার স্বর।
কোন
কিছুতে মনে কষ্ট পেলে ও শুধু গায়: এ্যা-এ্যা-এ্যা। এতে তোমার
সত্যি মনে দু:খ হবে।
মারিয়া ভলচক, প্রতিবেশী।
একটি জন্মভূমি নিয়ে
তিনটি সংলাপ
বক্তব্য: ক পরিবার- মা এবং মেয়ে, সেই সাথে একজন পুরুষ যে একটিও
কথা বলে না (মেয়েটির স্বামী)
মেয়ে: শুরুতে আমি প্রতিটি দিন-রাত কেঁদেছি। আমি কাঁদতে আর কথা বলতে
চাইতাম। আমরা তাজিকিস্থান থেকে এসেছি, দুশাম্বে থেকে। সেখানে একটি যুদ্ধ চলছে।
অবশ্য এসব বিষয়ে আমার এখন কথা বলা উচিত নয়। আমি মা হতে চলেছি-
আমি গর্ভবতী। তবু আমি তোমাকে বলবো। একদিন ওরা বাসে করে সবাই এলো। আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা
করবে। দেখলে একদম সাধারণ মানুষ বলে মনে হবে, পার্থক্য শুধু এই যে হাতে তাদের স্বয়ংক্রিয়
অস্ত্র ধরা। ওরা আমাদের কাগজ-পত্র দেখলো এবং তারপর পুরুষদের ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামিয়ে
দিল। আর তারপর বাসের দরজা থেকে নামিয়ে, সাথে সাথে আমাদের পুরুষদের সেখানেই গুলি করে
হত্যা করলো। নিজের চোখে না দেখলে এমন ঘটনা আমি সত্যি কখনো কানে শুনে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু
আমি এটা দেখেছি। আমি দেখেছি তারা দু’জন পুরুষকে গুলি করার জন্য
নিল। একজন ছিল এত অল্প বয়স আর সুদর্শন দেখতে। সে সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছিল।
তাজিক আর রুশ ভাষায়। ছেলেটি চেঁচিয়ে বলছিল যে তার স্ত্রী মাত্রই সন্তান প্রসব করেছে
আর তাদের তিনটি বাচ্চা আছে। কিন্তু সৈন্যরা একথা শুনে শুধুই হাসলো। এই
সৈন্যরাও বয়সে তরুণ ছিল, খুবই তরুণ। হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বাদ দিলে আমাদের মতই সাধারণ
মানুষ। রুশ আর তাজিক ভাষায় চেঁচানো ছেলেটি মাটিতে পড়ে গেল। বাঁচার আগে শেষ আকুতি হিসেবে
সে সৈন্যদের জুতোয় চুমু খেল। সবাই আমরা স্তব্ধ হয়ে রইলাম। আমরা যারা বাসে ছিলাম তারা
সবাই চুপ রইলাম। তারপর বাস আবার চলতে শুরু করলো আর আমাদের কানে এলো সৈন্যদের গলার স্বর: টা-টা-টা।
আমার আর পেছনে ফিরে তাকানোর সাহস হলো না (সে
কান্না শুরু করে)।
আমার এ বিষয়ে কথা বলা হয়তো আদৌ ঠিক না। সামনে আমার বাচ্চা হবে।
কিন্তু আমি তোমাকে
বলবো। শুধু একটা কথা: সাক্ষাৎকার নেবার সময় আমার পদবিটা লিখো না। আমি সভেৎলানা। আমাদের
আজো ওখানে আত্মীয়-স্বজন আছে। তারা সব জানতে পেলে আমার আত্মীয়দেরও খুন করবে। একটা সময়
আমার মনে হয়েছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর কখনো যুদ্ধ হবে না। এত বড় একটি দেশ, আমি ভাবতাম,
আমার প্রিয় স্বদেশভূমি! বৃহত্তম স্বদেশভূমি আমার! সোভিয়েত যুগে আমাদের বলা হতো যে আমাদের
গরীবের মত এবং খুব অনাড়ম্বর ভাবে থাকতে হবে কারণ আমাদের একটি বড় যুদ্ধ হয়েছিল। সাধারণ
মানুষ খুব কষ্ট সয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কষ্ট হলেও আমাদের যেহেতু একটি বড় আর শক্তিশালী
সেনাবাহিনী আছে, কেউ আর কোনদিন আমাদের স্পর্শ করতেও সাহস পাবে না। কেউ আমাদের হারাতে
পারবে না! কিন্তু তারপর আমরা একজন আর একজনকে গুলি করা শুরু করলাম। অতীতে যেমন যুদ্ধ হতো,
বর্তমানের সময়টা ঠিক তেমন নয়। অতীতের যুদ্ধ
বলতে আমার দাদুর কাছে শোনা যুদ্ধের কথা বলছি- সেই যেমন আমার দাদু জার্মানী অবধি পায়ে
হেঁটে, মার্চ করে গেছিলেন। আর আজ আমাদের দেশে এমন অবস্থা যে পড়শি পড়শিকে গুলি করে,
যে বালকেরা একটা সময় একসাথে স্কুলে গেছে তারা এখন এ ওকে খুন করে, বালিকাদের ধর্ষণ করে
যে বালিকাদের পাশে তারা স্কুল বেঞ্চিতে বসেছে। সবাই পাগল হয়ে গেছে আসলে।
আমাদের স্বামীরা নিশ্চুপ হয়ে আছে। এখানে সব পুরুষই আপাতত: নিশ্চুপ।
তারা তোমাকে কিছুই বলবে না। ঠিক মেয়েদের মতই এখানের পুরুষেরাও যখন পালাচ্ছিল, সবাই
তাদের দিকে চেঁচাচ্ছিল। এ যেন কাপুরুষের মত আচরণ, মাতৃভূমিকে প্রতারণা করা! কিন্তু
সেটা কি খুব খারাপ? গুলি
করতে না পারাটা কি খুব খারাপ? আমার স্বামী ছিলেন একজন তাজিক। তার বাইরে বের হওয়া এবং
মানুষজনকে গুলি করার কথা ছিল। কিন্তু ও বললো, ‘চলো
আমরা পালিয়ে যাই। আমি যুদ্ধে যেতে চাই না। আমার কোন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দরকার নেই।’
তাজিকিস্থান ছিল ওর জন্মভূমি। তবু ও তাজিকিস্থান ছেড়ে যেতে চাইলো। নয়তো সেনাবাহিনীর
সদস্য হিসেবে ওকে গুলি করতে হবে। খুন করতে হবে আর একজন তাজিককে। ও নিজেই যেমন একজন
তাজিক। কিন্তু এখানে ত’ ও একা। ওর ভাইরা আজো তাজিকিস্থানে
যেখানে সবাই যুদ্ধ করছে। এক ভাই ত’ মারাও গেছে। ওর মা সেখানেই বাস করেন। বোনেরা। দুশাম্বে
যাবার ট্রেনে চড়ে আমরা এখানে এসেছি; ট্রেনের জানালাগুলো ছিল ভাঙ্গা আর ভেতরটা ছিল ঠান্ডা।
কোন উত্তাপ ছিল না। তাজিকরা আমাদের গুলি করেনি তবে আমাদের ট্রেনের দিকে পাথর ছুঁড়ে
মারছিল, রেলের জানালা ভেঙ্গে ফেলছিল, ‘রুশরা, বের হও! আমাদের সাথে আর ডাকাতি করো না!’
আমার স্বামী নিজে তাজিক হলেও তাকে এসব কথাই শুনতে হয়েছে।
আমাদের বাচ্চাদেরও এসব শুনতে হয়েছে। আমার মেয়ে যখন প্রথম গ্রেডে
পড়ছে, সে একটি তাজিক ছেলেকে ভালবাসত। একদিন স্কুল থেকে বাসায় এসে বলে: ‘মা, আমি কে?
তাজিক না রুশ?’ ওকে কি বলে বোঝাতাম বা ব্যখ্যা করতাম?
আমার এসব বিষয়ে কথা বলা একদমই ঠিক নয়...তবু আমি তোমাদের বলছি।
তাজিকদের ভেতর আবার দু’টো শাখা। পামির তাজিক বা পামির মালভূমি অঞ্চলের তাজিকরা আবার
কুলিয়াব তাজিকদের সাথে লড়াই করছে। ওরা সবাই তাজিক। একই কোরান পড়ে বা একই বিশ্বাস বহন
করে। কিন্তু কুলিয়াবরা পামির তাজিকদের আর পামির তাজিকরা কুলিয়াবদের খুন করে। প্রথমে
তারা বের হয়ে পড়বে শহরের মূল চত্বরের দিকে আর চিৎকার করবে, প্রার্থনা করবে। আমি বুঝতে
চাইলাম যে কি হয়েছে। সুতরাং আমিও সেদিকে গেলাম। আমি ওদের ভেতরের একজন বৃদ্ধ মানুষকে
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনারা এখানে কিসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন?’ বৃদ্ধ উত্তর করলেন,
‘আইন সভার বিরুদ্ধে। সবাই আমাকে বলেছে যে সংসদ একজন ভারি বাজে মানুষ।’ এরপর ত’ গোটা
চত্বর ফাঁকা হয়ে গেল আর ওরা গুলি করা শুরু করলো। মূহুর্তেই দেশটা আমার অচেনা হয়ে গেল,
চেনা সম্ভব নয় এমন এক দেশ। প্রাচ্য! অথচ তার আগে আমরা ভাবতাম যে আমরা আমাদের নিজেদের
দেশেই বাস করছি। সোভিয়েত আইনের জোরে এমনটা আমরা ভাবতাম। এই তাজিকিস্থানে আজ কত রুশের
কবর পড়ে আছে। কিন্তু তাদের জন্য কাঁদবার কেউ নেই। রুশদের কবরখানায় ওরা গরু-ভেড়া চড়ায়। চড়ায় ছাড়ল।
বুড়ো রুশ পুরুষেরা ঘুরে বেড়ায়, ডাস্টবিনে খাবার খুঁজে বেড়ায়।
আমি একটি লেবার ওয়ার্ডে নার্স হিসেবে কাজ করতাম। আমার রাতে
ডিউটি থাকতো। একদিন এক নারী সন্তান জন্ম দিচ্ছে। বেশ কষ্টকর প্রসব প্রক্রিয়া তার। মেয়েটি
যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছিল- হঠাৎ এক আর্দালি ভেতরে দৌড়ে এলো। আয়া। কিন্তু
ওর হাতে দস্তানা নেই,
ইউনিফর্ম নেই। কি চলছে এসব? লেবার ওয়ার্ডে কি আড্ডা দিতে এসেছে নাকি? ‘মেয়েরা, এখানে
পুরুষেরা আছে! তারা মুখোশ পরে আছে, হাতে বন্দুক।’ সত্যি সত্যি উগ্রবাদী তাজিক পুরুষেরা
ঢুকলো : ‘আমাদের ওষুধ দাও! মদও দাও!’
‘আমাদের কাছে কোন ওষুধ বা মদ নেই!’
উত্তরে উগ্রবাদীরা ডাক্তারকে দেয়ালে ঠেসে ধরলো- আমাদের এখানেই
দাও! ঠিক এসময় কিনা প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা নারীটি স্বস্তির চীৎকার দিলো। আর
একটি সদ্যোজাত শিশু কান্না শুরু করলো। মাত্রই সে মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে এসেছে। আমি
একটু ঝুঁকলাম বাচ্চাটিকে দেখার জন্য। আজ মনে নেই সে ছেলে না মেয়ে শিশু ছিল। আমার কাছে
তাকে দেবার মত কোন নাম বা কোন উপহারও ছিল না। আর ডাকাতেরা আমাদের বলা শুরু করলো: এটা
কি? কুলিয়াব না পামির তাজিক? দ্যাখো অবস্থা- ছেলে না মেয়ে বাচ্চা সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন
নেই। সবার আগে প্রশ্ন হলো কুলিয়াব না পামির? আমরা কিছু বললাম না। ওরা চিৎকার শুরু করলো,
‘এটা কি? কুলিয়াব না পামির?’ আমরা কোন উত্তর দিলাম না। তাজিক উগ্রবাদীরা সদ্যোজাত বাচ্চাটিকে
খপ্ করে ধরলো। পৃথিবীতে বাচ্চাটি জন্মে পাঁচ কি দশ মিনিটও পার হতে পারেনি। তারা বাচ্চাটিকে
জানালা থেকে ফেলে দিলো। আমি একজন নার্স। জীবনেও এর আগে কখনো এই ভাবে কোন বাচ্চাকে মরতে
দেখি নি। আর এখন- গোটা ঘটনাটা মনেও করতে চাই না (কান্না শুরু করে)। এরপর তুমি কিভাবে
বেঁচে থাকবে? কিভাবে এরপর জন্ম দেবে? (কান্না)।
এরপর সেই লেবার ওয়ার্ডে আমার হাতের চামড়া উঠে যাওয়া শুরু হলো।
আমার হাতের শিরা ও ধমনী স্ফীত হতে থাকলো। আর আমি সবকিছুর প্রতি কি নির্বিকার হয়ে গেলাম!
বিছানা থেকে উঠতে চাইতাম না। (কান্না)। আমি হাসপাতালে যাব আর তারপর ঘুরতে শুরু করব।
আমি নিজেই তখন গর্ভবতী। সেখানে জন্ম দিতে পারিনি। তাই চলে এলাম এখানে। বেলারুশে। নারোভলিয়ায়।
ছোট্ট, শান্ত শহর। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করো না। আমি ত’ তোমাকে সবই বললাম (কান্না)।
অপেক্ষা করো। আমি চাই তুমি সবকিছু জানো। আমি ঈশ্বরের কাছে ভীত নই। আমি ভয় পাই মানুষকে।
শুরুতে আমরা মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করতাম, ‘তেজষ্ক্রিয়তা কি জিনিষ আসলে?’
‘তুমি কি দেখছো যে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ? এটাই তেজষ্ক্রিয়তা।’
তাহলে তেজষ্ক্রিয়তা সবজায়গায় রয়েছে? (কান্না)। চারপাশে সব খালি
ঘর-বাড়ি। মানুষজন সব চলে গেছে। তারা সবাই ভয় পেয়েছিল।
তবে আমি এখানে যেমনটা ছিলাম সেটা নিয়ে খুব ভয়ে ছিলাম না। আমাদের
ত’ কোন নির্দিষ্ট জন্মভূমিই ছিল না। কেউই আমাদেরকে তাদের নিজের মানুষ ভাবে না। জার্মানরা
জার্মানীতে চলে গেল, তাতাররা চলে গেল ক্রিমিয়ায়, কিন্তু কারোরই যেন রুশদের আর দরকার নেই। বেঁচে
থাকার জন্য আর কোন আশাই কি আমাদের অবশিষ্ট আছে? কিসের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা? রাশিয়া
কখনোই তার মানুষকে বাঁচায় নি। কারণ রাশিয়া এতবই বড় দেশ যে আয়তনে প্রায় সীমাহীন আকারের
বড়। আর সত্যি কথা বলতে, আমার কখনো রাশিয়াকে নিজের দেশ বলে মনেও হয় নি। কারণ আমরা ভিন্ন
ভাবে বড় হয়েছি। মাতৃভূমি হিসেবে জানতাম সোভিয়েত ইউনিয়নকে। এখন কিভাবে নিজেদের বাঁচাব
সেটা জানাও অসম্ভব। অন্তত: এখানে কেউ বন্দুক হাতে খেলছে না। এখানে তারা আমাদের একটি
ঘর দিয়েছে, আমার স্বামীকে একটি চাকরি দিয়েছে। দেশের বাড়িতে থাকা আমাদের বন্ধুদের আমরা
চিঠি লিখেছি আর গতকাল তারা এসেছিল। তারা ভাল আছে। রাতের বেলা পৌঁছে রেল স্টেশন থেকে
বের হতে ওরা ভয় পাচ্ছিল। স্টেশনেই সারা রাত থেকে যায় ওরা। স্যুটকেসের উপর বসে থেকে
এবং বাচ্চাদের একদম বের হতে না দিয়ে। আর তারপর ওরা দ্যাখে: মানুষজন সব রাস্তায় হাঁটছে,
হাসছে, ধূমপান করছে। এখানকার স্থানীয় মানুষেরা আমার বন্ধুদের রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে,
অন্যদের ঠেলে-ঠুলে তাদের আমাদের বাসায় সাবধানে নিয়ে এসেছে। আমাদের বন্ধুরা ত’ অবাক
হয়ে গেল। কারণ তাজিকিস্থানে স্বাভাবিক জীবন কি তারা ভুলে গেছিল। সেখানে স্বাভাবিক জীবন
যাপন করা তারা ভুলেই গেছিল। এখানে ওরা ঘুম থেকে উঠে দোকানে গেল আর দেখতে পেল মাখন আর
ননী- আর তারপর পাঁচ বোতল ননী কিনে ফেললো এবং সাথে সাথেই খেয়ে নিল সব। মানুষজন ত’ সব
হাঁ করে ওদের দেখছে যেন পাগল দেখছে। কিন্তু তাজিকিস্থানে আমার বন্ধুরা ত’ গত দু’বছরে
মাখন বা ননী চোখে দ্যাখে নি। তাজিকিস্থানে তুমি এমনকি এক টুকরো রুটিও কিনতে পাবে না।
সেখানে যুদ্ধ চলছে। সেখানে যে বাস্তবে কি অবস্থা তা’ যে দ্যাখে নি তাকে বলে বোঝানোটা
বেশ কঠিন।
আমার আত্মা ত’ সেই তাজিকিস্থানে থাকতেই মরে গিয়েছিল। যে শিশু
আমি জন্ম দেব তার ত’ কোন প্রাণই যেন থাকবে না। এখানে অনেক মানুষ নেই আর ঘরগুলো সব ফাঁকা।
আমরা বনের পাশে থাকি। অনেক মানুষের ভিড় আমার ভাল লাগে না। রেল স্টেশনের মত গিজগিজে
ভিড় কখনোই পছন্দ নয় আমার। কিম্বা যুদ্ধের সময় যে অবস্থা দেখা যায়। (মেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং কথা বলা বন্ধ করে
দেয়)।
মা:
যুদ্ধ- এটাই একমাত্র বিষয় যা নিয়ে আমি কথা বলতে পারি। আমরা
এখানে এসেছিলাম কেন? এই চেরনোবিলে? কারণ এখানে অন্তত: কেউ আমাদের মারতে আসবে না। এখান
থেকে কেউ অন্তত: আমাদের তাড়িয়ে দেবে না। এটা আর কারোরই ভূমি নয় এখন। এটি ঈশ্বর নিয়ে
নিয়েছেন। এ জায়গা ছেড়ে প্রায় সব মানুষই চলে গেছে।
দুশাম্বেতে আমি ছিলাম রেল স্টেশনের উপ প্রধান। সেখানে আর একজন
উপ প্রধান ছিলেন। তিনি ছিলেন তাজিক। আমাদের বাচ্চারা একসাথেই বড় হয়ে উঠেছে। একসাথেই
স্কুলে গেছে বা ছুটির দিনগুলোতেও আমরা দেখা-সাক্ষাৎ করতাম। যেমন, নতুন বছরের প্রথম
দিনে বা মে দিবসে। আমরা একসাথে বীয়ার পান করতাম বা প্লফ খেলতাম। সেই তাজিক ভদ্রলোক
সবসময় আমাকে ‘বোন, আমার রুশী বোন’ বলে ডাকতেন।
একই অফিসে আমরা বসতাম। সেই ভদ্রলোক হঠাৎ একদিন আমার অফিস ডেস্কের সামনে এসে চিৎকার
করে বলছে কি: ‘তুমি রাশিয়া যাচ্ছ কবে? এটা আমাদের ভূমি!’
আমার ত’ মনে হল আমার মাথাটা পাগল হয়ে গেল এটা শুনে। আমি তাঁর
সামনে লাফিয়ে পড়লাম:
‘তোমার কোটটা কোথাকার শুনি?’
‘লেনিনগ্রাদের,’ খানিকটা অবাক হয়েই বললেন সেই সহকর্মী।
‘ঐ রুশী কোট গা থেকে খুলে ফ্যালো কুত্তার বাচ্চা!’ বলতে বলতে
আমি তার গা থেকে কোট টেনে ফেললাম।
‘তোমার মাথার টুপিটা কোথাকার? একবার ত’ বেশ দেমাক ভরে বলেছিলে
এটা সাইবেরিয়ার টুপি। খোল- খোল বলছি! শার্টটাও খোল। আর প্যান্টটাও! ওগুলোও মস্কোতে
বানানো। সেগুলোও রুশী জিনিষ!’
মেজাজ এতটা চড়ে গেছিল যে তার পরণের শুধু আন্ডারওয়্যারটা আমি
টান দিই নি। আমার এই সহকর্মীটি বেশ লম্বা ছিল। আমি তার কাঁধ পর্যন্ত হতাম। তবু আমি
গায়ের কাপড়-চোপর প্রায় সবটাই টেনে ছিঁড়ে ফেলেছি। চারপাশে ভিড় জমছিল। সহকর্মী ততক্ষণে
চিৎকার জুড়েছেন: ‘আমার কাছ থেকে সরে যাও! পাগল কোথাকার!’
‘না, যা যা কিছু তোমার গায়ে রুশী জিনিষ-পত্র আছে সব আমাকে দিয়ে
দাও! আমি সবকিছু নিয়ে যাব!’
আমি যেন সত্যিই পাগল হয়ে গেছিলাম।
‘আমাকে তোমার মোজা দাও! জুতা দাও!’
সারা দিন এবং রাত ধরে আমি তখন কাজ করেছি। ট্রেনে বোঝাই হয়ে
মানুষ তাজিকিস্থান ছেড়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রাণ ভয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রচুর রুশী প্রাণ হাতে
নিয়ে পালাচ্ছে- হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। তবু সেই আতঙ্কিত তাজিকিস্থানের ভেতর কোথাও
এক টুকরো রাশিয়া তখনো ছিল। ভোর রাত দু’টোয় দেখছি মস্কো ট্রেন আসছে। আর কুরগান-তিয়ুব
শহর থেকে আসা শিশুরা তখনো আমাদের রেল স্টেশন অফিসের হল ঘরে গাদাগাদি করে ছিল। ওরা ট্রেনের
কাছে ভিড়ছিল না। আমি ওদের লুকিয়ে রাখলাম। দু’জন পুরুষ আমার কাছে এলো, তাদের হাতে স্বয়ংক্রিয়
অস্ত্র।
‘ছেলেরা- তোমরা এখানে কি করছো?’ ধড়ফড়ে বুকে আমি তাদের প্রশ্ন
করলাম।
‘দোষ ত’ তোমার- সব দরজা খোলা রেখেছো!’
‘আমি ট্রেন পাঠাচ্ছিলাম। ট্রেন বন্ধ করার কোন সুযোগ হয় নি।’
‘ওখানে ঐ বাচ্চারা কারা?’
‘আমাদের বাচ্চা ওরা, দুশাম্বে থেকে এসেছে।’
‘ওরা কুর্গান থেকে আসেনি ত’? ওরা কি কুলিয়াব?’
‘না, না, ওরা আমাদের।’
কাজেই এই তাজিকেরা চলে গেল। কিন্তু যদি ওরা রেল অফিসের হল রুম খুলত? তারা
বাচ্চাগুলোর মাথায় গুলি করতো হয়তো...হয়তো আমার মাথাতেও। এখানে ত’ সরকার বলতে ঐ একটিই-
যাদের হাতে বন্দুক আছে তারাই সরকার। সকালবেলা রুশ বাচ্চাগুলোকে আমি আস্ত্রাখানগামী
একটি রেলগাড়িতে তুলে দিলাম। কন্ডাকটরদের বললাম বগী ভর্তি তরমুজ নেবার সময় তারা যেমন
দরজা খোলে না, এই বাচ্চাগুলোর প্রাণ বাঁচাতেও গন্তব্যে না পৌঁছনো অবধি তারা যেন দরজা
না খোলে। (নি:শব্দ, তারপর দীর্ঘ সময় ধরে কান্না)। মানুষের চেয়ে ভীতিকর আর কি আছে পৃথিবীতে?
(পুনরায় নৈ:শব্দ্য)।
একবার, আমি তখন ইতোমধ্যে এখানে চলে এসেছি, আমি রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম
এবং হঠাৎ পেছনে তাকানো শুরু করলাম। কেন জানি মনে হলো কেউ আমাকে অনুসরণ করছে। তখন এমন
একটি দিন যায়নি যেদিন মৃত্যুর কথা ভাবিনি। সারাজীবন কাজে যাবার সময় আমি ঘর ছেড়েছি পরিষ্কার
কাপড় পরে। ধোওয়া ব্লাউজ, স্কার্ট এবং অন্তর্বাস সমেত। যদি কেউ আমাকে খুনও করে তবু আমাকে
পরিষ্কার কাপড়েই পাওয়া যাবে। আর এখন আমি বনের ভেতর দিয়ে একা একা পথ চলি এবং কাউকেই
ভয় করিনা। বনে একটি জনপ্রাণী নেই, বিরান সবকিছু। হাঁটতে হাঁটতে ভাবি যা কিছু আমার সাথে
হয়েছে তার সব কিছুই কি ঘটেছে বা ঘটেনি? কখনো কখনো আমি ছুটে যাব কোন কোন শিকারীর কাছে:
তাদের হাতে আছে বন্দুক, একটি কুকুর আর ডসিমিটার। তাদের বন্দুকও আছে। তবে তারা অন্যদের
মত না। তারা কারোর ক্ষতি করে না (নি:শব্দ)।
এক লোকের কথা মনে পড়ছে। তাকে আমি দেখেছিলাম আর একটি লোককে ধাওয়া
করতে। যেভাবে সে অন্য লোকটিকে হাঁফাতে হাঁফাতে ধাওয়া করছিল, তাতে এটা স্পষ্ট যে আসলে
দ্বিতীয় লোকটিকে খুন করতে চাইছিল। কিন্তু অন্যজন আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে
হঠাৎই একটি রাস্তা পেয়ে গেল। সে লুকলো। আর যে খুন করতে চাইছিল সে তখন ফিরে এলো। আমার
কাছে হেঁটে এসে বললো, ‘মহাশয়া- এখানে আশপাশে কি একটু খাবার জল হবে?’ স্টেশনে আমাদের
এক বালতি জল ছিল। আমি জলের বালতিটা তাকে দেখালাম। তারপর সোজাসুজি লোকটার চোখের দিকে
তাকিয়ে বললাম, ‘তোমরা কেন এ ওকে ধাওয়া করছো? খুনোখুনিই বা কেন করছো?’ লোকটিকে তখন মনে
হলো খানিকটা যেন বা লজ্জিত বা বিব্রত, ‘ঠিক আছে মহোদয়া, দয়া করে এত জোরে বলেন না।’
সে তখনকার মত এটা বললো ঠিকই। কিন্তু তাজিকরা নিজেরা যখন নিজেদের ভেতর জড়ো হয়, তখন তাদের
একদম ভিন্ন চেহারা। তারা তিনজন এমনকি দু’জন মানুষ একত্র হলেও আমাকে দেয়ালে ঠেসে ধরবে।
একজন-একজন হলে তবু কথা বলা যায়।
দুশাম্বে থেকে আমরা তাসখন্দে এলাম। তবে পরে আমাদের আরো দূরে-
মিনস্কে যেতে হলো। কোন টিকিট ছিল না- একটিও না! যেভাবে তারা সবকিছু সাজিয়েছে তার চাতুর্যের
প্রশংসা করতেই হয়। অবস্থা এমন যে কাউকে ঘুষ না দেয়া অবধি তুমি একটি টিকিট পাবে না।
কেবল ঘুষ দেবার পরেই দেখবে সব কিছু মসৃণ। চারদিকে অন্তহীন সমস্যা: এটা এত ভারি, ওটার
আয়তন এত বিপুল, তুমি এটা নিতে পারো না, ওটা তোমাকে ফেলে যেতে হবে। আমার প্রতিটা জিনিষ
পাল্লায় দু’বার করে মাপতে হলো যতক্ষণ না অবধি আমি বুঝলাম আসলে তারা যা চাইছে সেটা হলো
ঘুষ। তা’ আমি তখন কিছু টাকা দিয়ে বললাম, ‘এত তর্কাতর্কির চেয়ে সব কিছু কি প্রথম থেকেই
শুরু করা যায় না?’ ব্যস, সবকিছু তখন দিব্যি সহজ হয়ে গেল! আমাদের কন্টেইনারটা ছিল দুই
টন ভারি। সেটা স্টেশনের লোকরা আমাদের দিয়ে খালি করিয়ে নিয়ে দেখল। বললো, ‘তোমরা ত’ যুদ্ধের
জায়গা থেকে আসছ। হতে পারে তোমাদের এই কন্টেইনারের ভেতর অস্ত্র কিম্বা মারিজুয়ানা?’
সেখানে আমাদের দু’ রাত রাখা হলো। আমি স্টেশন বসের কাছে গেলাম যেখানে একজন ভাল নারীর
সাথে আমাদের পরিচয় হলো। তিনি আমাদের সব কিছু বুঝিয়ে বললেন, ‘এখানে তুমি কিছু পাবে না।
তুমি হয়তো ভাল ব্যবহার আশা করছো। ওদিকে ওরা তোমার কন্টেইনার ছুঁড়ে ফেলবে ক্ষেতের ভেতর
আর তোমার সব কিছু হাতিয়ে নেবে।’ কাজেই কি করা যায়? সারা রাত ধরে আমরা কাপড়-চোপর, কিছু
মাদুর, একটি পুরণো ফ্রিজ আর দুই বস্তা বই গোছালাম।
‘তুমি কি এই দামি বইগুলো জাহাজে তুলে দিচ্ছ?’
একবার বইগুলোর দিকে তাকালাম: চের্ণিশেভস্কির কি করা যায়? শলোকভের
উর্দ্ধমুখী কুমারী মৃত্তিকা- এমন সব বই। মোটেই দামি কিছু নয়। আসলে ওরা
ঘুষ চাইছে। কাজেই আমরা হাসলাম, ‘তোমার কয়টা ফ্রিজ দরকার?’
‘একটা- ঐ ভাঙা ফ্রিজটা হলেই চলবে।’
‘তোমরা কেন ঘোষণাপত্র সাথে আনোনি?’
‘কিভাবে জানব? এই প্রথম আমরা একটি যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাচ্ছি।’
এভাবেই আমরা দু’টো মাতৃভূমি হারালাম। একটি তাজিকিস্থানে আর
একটি সোভিয়েত ইউনিয়নে।
আমি আজ অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলি আর শুধু চিন্তা করি। সবাই
শুধু টেলিভিশন দ্যাখে- সেখানে কি ঘটছে? সবাই কেমন আছে? আমি কিছু জানতে চাই না।
আমাদের একটা জীবন ছিল- একটি ভিন্ন ধাঁচের জীবন। আমাকে একজন
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভাবা হতো। আমার ছিল সামরিক পদমর্যাদা। প্রশিক্ষণ-নির্ভর একটি
বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্ণেল। কিন্তু এখানে আসার পর আমি বেকার হয়ে পড়ি এবং
পৌর কাউন্সিল অফিসের মেঝে ঝাড়– দেবার কাজ পাই। এখন আমি মেঝে পরিষ্কার করি। এই জীবনটা
একরকম চলে গেছে। আর একটি নতুন জীবন শুরু করার
মত শক্তি আর আমার অবশিষ্ট নেই। এখানে কিছু মানুষ আমাদের অবস্থা দেখে সহানুভূতি বোধ
করে আবার কেউ কেউ আমাদের প্রতি বিরক্ত হয়, ‘উদ্বাস্তুরা আলু চুরি করছে, রাতে ওরা মাটি থেকে
আলু খুঁড়ে বের করে।’ আমার মা বলেন যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মানুষ এ ওকে মায়া করত।
সম্প্রতি বনে একটি ঘোড়া পাওয়া গেছে যেটি কিনা পাগল হয়ে গ্যাছে। ঘোড়াটি মরেও গ্যাছে।
আর এক জায়গায় একটি মৃত খরগোশ পাওয়া গেছে। এই ঘোড়াটিকে বা খরগোশটিকে কেউ মারে নি। তবু
ওদের মৃত পাওয়া গেল। এটাই সবাইকে চিন্তিত করেছিল। কিন্তু পরে যখন এক পুড়ে মরা মানুষকে পাওয়া
গেল, কেউই আর এটা নিয়ে কিছু ভাবে নি। কারণ যে জন্যই হোক না কেন, মানুষ ততদিনে মৃত মানুষের
বিষয়ে গা সহা হয়ে গেছে।
লেনা এম- কিরঘিজিস্তান থেকে আগত। তিনি তাঁর বাড়ির দরজায় এমনভাবে
বসে ছিলেন যেন কোন ছবি তোলার জন্য প্রস্তত। তাঁর পাঁচ সন্তান তাঁর কাছে বসে। সাথে তাঁর
বেড়াল মেটেলিৎসাও ছিল যাকে তিনি সাথে এনেছেন।
আমরা স্থান ত্যাগ করলাম যেন যুদ্ধ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমরা সব
কিছু দখল করেছিলাম। আর বেড়ালটা আমাদের সাথে রেল স্টেশনে পিছু পিছু হেঁটে চলল। কাজেই
ওকেও আমরা নিলাম। আমরা ট্রেনে কাটিয়েছি বারো দিন। শেষের দু’দিন আমরা ক্যানের বাঁধাকপি
আর সেদ্ধ জল মিশিয়ে খেয়েছি। ট্রেনের দরজা আমরা পাহারা দিয়েছি একটি লৌহদন্ড, কুড়াল আর
হাতুড়ি দিয়ে যেন কোন উগ্রবাদী প্রবেশ করতে না পারে। আমি এটা এভাবেই রাখব- এক রাতে কিছু
লুণ্ঠনকারী আমাদের আক্রমণ করল। তারা আমাদের প্রায় হত্যাই করতে যাচ্ছিল। আজকাল কেউ তোমাকে
একটি টেলিভিশন বা ফ্রিজের জন্যও আক্রমণ করবে। যেন একটি রণাঙ্গণ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার
হাল আমাদের, যদিও এখনো অবধি কিরঘিজিস্থানে ব্যাপক আকারে গোলাগুলি শুরু হয়নি। এমনকি
গর্বাচেভের শাসনামলেও নানা হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে- ওশেতে এমনটি হয়েছে, কিরঘিজ এবং উজবেকদের
ভেতরে- তবে কোনমতে শেষমেশ থামানো গ্যাছে। কিন্তু আমরা ত’ রুশ। কিরঘিজরা অবশ্য রুশ বলে
খানিকটা আমাদের ভয়ও পায়। আপনি রুটি নিতে লাইনে দাঁড়াবেন আর শুনবেন কিরঘিজদের চিৎকার,
‘রাশিয়ান- বাড়ি যাও! কিরঘিজদের জন্য কিরঘিজিস্থান!’ আর তারা আপনাকে লাইনের বাইরে ঠেলে
দেবে। আর তারপর তারা কিরঘিজ ভাষায় আরো দু/চার লাইন বেশি কথা বলবে যার অর্থ হলো, ‘আমাদের
নিজেদেরই রুটি নেই। আবার আমরা কিনা ওদের বাড়তি খাওয়াবো?’ আমি অবশ্য ওদের ভাষা খুব ভাল
জানি না। তবে সামান্য কিছু শব্দ শিখেছিলাম যা দিয়ে বাজারে দর-দস্তুর করতে বা জিনিষ-পত্র
কেনা-কাটা করতে সমস্যা হত না।
আমাদের একটি মাতৃভূমি ছিল যা আজ আর নেই। আমি কে? যার মা উক্রানীয়
আর বাবা রুশ। আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা কিরঘিজিস্থানে। আমি বিয়ে করেছি এক তাতারকে। তাহলে
আমার বাচ্চারা? তাদের জাতীয়তা কি? আমরা সবাই মিলে-মিশে গেছি। আমাদের রক্ত মিলে-মিশে
গেছে। আমার পাসপোর্টে, অর্থাৎ আমার এবং আমার বাচ্চাদের পাসপোর্টে জাতীয়তার পরিচয়ে
‘রুশ’ লেখা। কিন্তু আমরা ত’ রুশ ছিলাম না। আমরা ছিলাম ‘সোভিয়েত।’ কিন্তু সেই যে দেশ অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন
নামে যেখানে আমি জন্মেছিলাম সেই দেশ আজ আর কোথাও নেই। যে ভূখন্ডকে আমাদের ‘মাতৃভূমি’
জানতাম তা’ আজ আর কোথাও নেই। সেই সময়টিও নেই। আমার পাঁচ সন্তান। সবচেয়ে বড়টি অষ্টম
শ্রেণীতে আর সবচেয়ে ছোটটি কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। আমি ওদের এখানে নিয়ে এসেছি। আমাদের
দেশ আর নেই। কিন্তু আমরা আছি।
অথচ একটা সময় আমি ছিলাম এক সুখী মানুষ। প্রতিটি সন্তান ছিল
আমার ভালবাসার মানুষের সাথে- আমার প্রেমের সন্তান। পাঁচটি বাচ্চা আমার। ওরা জন্মাল
এভাবে: ছেলে, ছেলে, ছেলে আর তারপর মেয়ে, মেয়ে। আর কথা বলতে চাই না। আমি তবে কান্না
শুরু করবো। (একথা বলে তিনি আরো কাঁদলেন)। আমরা চেরনোবিলেই অপেক্ষা করবো। এটাই এখন আমাদের
ভূমি, আমাদের মাতৃভূমি। (হঠাৎ তিনি হাসেন)। এখানকার পাখিগুলো অন্যজায়গার পাখিদের মতই।
এবং এখানে আজো লেনিনের একটি ভাস্কর্য আছে। (আমরা যখন বিদায় নিচ্ছিলাম তখন তিনি আরো
কিছু কথা বললেন)। একদিন সকালে কিছু প্রতিবেশী আমার দরজায় এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছে যেন
জানালার খড়খড়ি কেঁপে উঠছে। আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি
কোথা থেকে এসেছেন?’
‘চেচনিয়া থেকে।’
তিনি আর কিছু না বলে কাঁদতে শুরু করলেন।
সাধারণ মানুষ ত’ সব কিছু বুঝেও পারে না। ‘তোমরা কেন শিশুদের
হত্যা করছো?’ হে ঈশ্বর, আগামীকাল যা ঘটতে যাচ্ছে তা’ কিকরে আজই আনার শক্তি পাচ্ছ তুমি?
আমি ত’ ওদের হত্যা করছি না। আমি বরং তাদের রক্ষা করছি। আজ আমি চল্লিশ বছরের এক মানুষ
আর পুরোপুরি ধূসর হয়ে গেছি। আর অন্যরা বিষ্মিত। তারা কিছু বোঝে না ।তারা বলে: ‘তুমি
কেন চেরনোবিলে বাস করতে এলে? তোমার বাচ্চাদের নিয়ে তুমি কি এমন কোন জায়গায় যাবে যেখানে
কলেরা অথবা মহামারী রয়েছে?’ কিন্তু সে ত’ কলেরা বা মহামারীর বিষয়ই বটে।
এখানে চেরনোবিলে বসবাস করা কি অতটাই ভয়ঙ্কর? আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি না। এটা আমার
স্মৃতিশক্তির অংশ নয়।
অনুতাপ বিষয়ক সংলাপ
আমি গোটা পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রথমে আমি রেল স্টেশনগুলোয় ঘুরে বেড়াতাম। সেখানে
থাকতে আমার ভালই লাগতো। চারপাশে কত মানুষ আর তুমি নিজের মত একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছ। তারপর
এখানে ফিরে এলাম। এখানে যেন অবাধ মুক্তি।
আমি আমার নিজের জীবনটা ভুলে গেছি। আমাকে সে বিষয়ে আর কিছুই
জিজ্ঞাসা করো না। বইয়ে যা যা পড়েছি সেসব বেশ স্মরণ করতে পারি কিম্বা মানুষ আমাকে অতীতে
কি কি বলেছে তা-ও। কিন্তু নিজের জীবনটাই বেমালুম ভুলে গেছি। সে প্রায় অনেক দিন আগের কথা। আমি ভুল
করেছিলাম। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন পাপ নেই যার জন্য অনুতাপ আর প্রায়শ্চিত্ত আন্তরিক ভাবে
করা হলে ঈশ্বর সেটা ক্ষমা করেন না।
একজন ব্যক্তি বাস্তবে সহজে সুখী হতে পারে না। সুখী হবার কথাও
নয় অত সহজে। ঈশ্বর দেখলেন যে আদম একা এবং তিনি তখন ঈভকে তার জন্য দিলেন। সুখের জন্য,
পাপের জন্য নয়। কিন্তু মানুষ ত’ নিজেই আসলে সুখী হতে সক্ষম নয়। যেমন ধরো আমার কথা। আমি উষা বা
গোধূলীকালীন সময় পছন্দ করি না। অন্ধকারও পছন্দ করি না। এই করিডোর এখন যেমন আলো এবং
অন্ধকারের মাঝামাঝি আবহে রয়েছে। আমি এখনো বুঝতে পারছি না যে আমি কোথায় ছিলাম- কেমন
ছিলাম- এবং এসব কোন বিষয় নয় আসলে। আমি বাঁচতে পারি কিম্বা না পারি সেটা সত্যিই কোন
বিষয় না । মানুষের জীবন হলো অনেকটা ঘাসের মত: এটা ফোটে, শুকিয়ে যায় এবং তারপর আগুনের
খাদ্য হয়। আমি ধ্যানের প্রেমে পড়েছিলাম। এখানে তুমি পশু বা শৈত্যের আক্রমণে একইভাবে
মারা যেতে পারো। কয়েকশ কিলোমিটারের ভেতর এখানে কোন জনমানুষ নেই। উপবাস এবং প্রার্থনার
মাঝে তুমি দানবদের সাথে লড়াই করতে পারো। দেহের মাংসকে সংযত করার জন্য উপবাস এবং আত্মাকে
রক্ষার জন্য প্রার্থনা করতে পারো। কিন্তু আমি কখনোই একা নই। একজন ব্যক্তি যে
বিশ্বাসী সে কখনোই একা নয়। আমি সব গ্রামের পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াই- স্প্যাগেটি, ময়দা আর
এমনকি উদ্ভিজ তেল পর্যন্ত আমি খুঁজে পেতাম। টিনজাত ফল। এখন আমি কবরখানায় যাই- মৃতদের
জন্য তাদের পরিবার-পরিজন খাবার আর পানীয় রেখে যায়। কিন্তু মৃতদের এসব দরকার হয় না। তারা এসবে
কিছু মনে করে না। ক্ষেতগুলোয় পড়ে থাকে বুনো শস্য এবং অরণ্যে থাকে ব্যাঙের ছাতা আর বেরি
ফল। এখানেই স্বাধীনতা।
ফাদার সের্গেই বুলগাকভের লেখা একটি বই আমি পড়ি- ‘এটা নিশ্চিত
যে ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং কাজেই পৃথিবী ব্যর্থ হতে পারে না,’ আর তাই এটি একান্ত
দরকারী যে ‘ইতিহাসকে সাহসের সাথে সহ্য করে যাও পৃথিবীর শেষ দিন অবধি।’ অপর এক চিন্তাবিদ
বলেন- তাঁর নামটি আমার মনে নেই তবে তিনি বলেন, ‘মন্দ বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই। ভালর
অনুপস্থিতিই হলো মন্দ ঠিক যেমন আলোর অনুপস্থিতি হলো অন্ধকার।’ এখানে বই খুঁজে পাওয়া
সহজ। অবস্থা এমন যে এখানে একটি মাটির কলস বা চামচ কি কাঁটাচামচ খুঁজে পাওয়া কঠিন কিন্তু
বই আছে বিস্তর। আর একদিন
খুঁজে পেলাম পুশকিনের রচনা সংগ্রহের একটি খন্ড। ‘এবং মৃত্যুর চিন্তা আমার আত্মার কাছে
প্রিয়।’ আমি সেটা স্মরণ করলাম। হ্যাঁ: ‘মৃত্যুচিন্তা।’ এখানে আমি একা। আমি মৃত্যুর
চিন্তা করি। আমি চিন্তা করতে আজকাল ভালবাসি। এবং নৈ:শব্দ্য তোমাকে প্রস্তÍত হতে সাহায্য
করে। মানুষ মৃত্যুর সাথে বসবাস করে। তবে বুঝতে পারেনা যে মৃত্যু আসলে কি। কিন্তু
এখানে আমি একা। গতকাল
স্কুলের বাইরে আমি একটি নেকড়ে এবং তার মাদী-নেকড়েকে তাড়া করেছি। তারা সেখানে বাস করছিল।
প্রশ্ন: পৃথিবীটাকে যেভাবে বর্ণনা করা হয় বাস্তবে পৃথিবী কি
তেমন? ব্যক্তি এবং তাঁর আত্মার ভেতর শব্দসমূহ দাঁড়িয়ে থাকে।
এবং আমি এটা বলবো: আগে যেমন ছিল তার চেয়ে বরং এখন গাছেরা, পাখিরা
এবং পিঁপড়েরা আমার ঢের বেশি কাছের। আমি তাদের কথাও ভাবি। মানুষ আতঙ্কদায়ক। এবং বিচিত্রও
বটে। কিন্তু আমি
এখানে কাউকে খুন করতে চাই না। আমি এখানে মাছ ধরি, আমার একটি বড়শি আছে । আমি গুলি ছুঁড়ে
কোন প্রাণী হত্যা করি না ।আমি ফাঁদ পাতি না। কাউকে হত্যা করার ইচ্ছা হয় না আমার।
প্রিন্স মিশকিন বলেছিলেন, ‘এটা কি সম্ভব যে একটি গাছ দেখেও
কেউ খুশি হবে না?’
মন্দ কোনকিছুর দিকে দেখারই বা দরকার কি? মন্দও জরুরি, অতি অবশ্যই।
পাপ ত’ পদার্থবিদ্যার কোন বিষয় নয়। যা অনস্তিত্ব তার অস্তিত্বও তোমার স্বীকার করে নিতে
হবে। বাইবেলে বলছে, ‘যারা আলোতে হাঁটে তাদের জন্য একটি রাস্তা আর অন্যদের জন্য শিক্ষা
রয়েছে।’ তুমি একটি পাখি বা অন্য কোন জীবিত প্রাণীর কথাই ধরো- আমরা তাদের বুঝতে পারি
না। কারণ তারা নিজেদের জন্য বাঁচে এবং অন্যদের জন্য বাঁচে না। হ্যাঁ। চারপাশের সবকিছুই
তরল। এককথায় বললে।
আমি খুব সাদা-সিধা ভাবে প্রার্থনা করি। আমার নিজের জন্য প্রার্থনা
করি। হে ঈশ্বর, আমাকে ডেকে নাও! আমাকে শোন! শুধুমাত্র মন্দ মানুষই চতুর এবং পরিশীলিত
হয়। কিন্তু যখন
মানুষ প্রেমের সৎ বাক্য বলে, তখন তাকে কত সাদা-সিধা আর সহানুভূতিশীল মনে হয়। এমনকি
দার্শনিকরা যখন তারা যেভাবে ভাবেন সেই ভাবনার ঠিকঠাক প্রকাশ করার মত শব্দ খুঁজে পান,
সেসব শব্দও বড় চমৎকার। একটি প্রার্থনায় ব্যবহৃত শব্দগুলো যখন হুবহু ঐ প্রার্থনার মূল
ভাবনা এবং সারাৎসারের সাথে মিলে যায়, তখনি সেটি প্রকৃত প্রার্থনা। আমি এটা রীতিমতো
শারীরিক ভাবেই সত্য বলে মানি। হে ঈশ্বর, আমাকে ডেকে নাও! আমাকে শোন!
এবং মানুষও গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মানুষের ব্যপারে ভীত। তবু মানুষের সাথে আজো মিশতে চাই।
একজন ভাল ব্যক্তির সাথে মিশতে চাই। হ্যাঁ। এখানে কেউ হয় লুটপাটকারী অথবা কেউ লুকিয়ে
আছে আমার মত কিম্বা যারা শহীদ হয়েছে তারা ছাড়া আর কেউ নেই।
আমার নাম কি? আমার কোন পাসপোর্ট নেই। পুলিশ এটা নিয়েছে। তারা
আমাকে পিটিয়েছে।
‘তুমি কেন ঘুরে বেড়াচ্ছ?’
‘আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি না। আমি পরিতাপ করছি।’
পুলিশ এরপর আমাকে আরো জোরে পেটালো। তারা আমাকে মাথায় আঘাত করলো।
সুতরাং তোমার লেখা উচিত: ‘ঈশ্বরের দাস নিকোলাই এখন একজন মুক্ত মানব।’
প্রত্যাগতদের একাকী
সংলাপ
গোমেল অব্লাস্টের নারোভলিয়ানস্ক অঞ্চলে বেলি বেরেগ গ্রামে,
বিষ্ফোরণের পর যে গ্রাম খালি করে দেওয়া হয়।
বক্তা: আন্না আর্তুশেঙ্কো, ইভা আর্তুশেঙ্কো, ভাসিলি আর্তুশেঙ্কো, সোফিয়া মরোজ, নাদেজদা নিকোলায়েঙ্কো,
আলেক্সান্দার নিকোলায়েঙ্কো, মিকাইল লিস।
‘আর আমরা সব কিছুর ভেতর দিয়ে বেঁচেছি, সব কিছু সয়ে গেছি।’
‘ওহ, সেসব কথা আমি আর স্মরণও করতে চাই না। সে কথা মনে করাও
ভীতিজনক। তারা আমাদের তাড়া করেছে, সৈন্যরা আমাদের তাড়া করেছে। বড় সামরিক ট্যাঙ্কগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকছে যা মূলত: সব ধরণের ভূমির উপর
চলতে সক্ষম। এক বৃদ্ধ লোক- তিনি ইতোমধ্যে মাটিতে গড়াচ্ছিলেন। মৃত্যু সন্নিকটে তাঁর।
কোথায় যাচ্ছিলেন তিনি?
আমি একবার উঠে দাঁড়াতে চাই, বুড়ো লোকটা কাঁদছে আর বলছে, ‘আর
হেঁটে হেঁটে কবরখানায় যেতে চাই। সে কাজটুকু একা একাই করতে চাই। আমাদের বসতভিটা থেকে
উচ্ছেদ করে ওরা কি আমাদের অর্থমূল্য দিতে চায়? কি দেবে ওরা? তাকিয়ে দ্যাখো এদিকটা কত
সুন্দর! কারা আমাদের সৌন্দর্যের জন্য এতটা মূল্য দেবে? এটা ত’ একটি রিসোর্ট এলাকা!’
“বিমান, হেলিকপ্টার- এত শব্দ ছিল চারপাশে। ট্রাক্টরে টানা ট্রাক।
সৈন্যরা। ভাল, আমি ভাবলাম যে যুদ্ধ বুঝি আবার শুরু হয়েছে। হয় চীণা বা মার্কিনীদের সাথে।”
‘আমার স্বামী যৌথ খামার থেকে বৈঠক সেরে ফিরেছে; ফেরার পর বলছে,
আগামীকাল আমাদের এ জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমি বললাম, আলুগুলোর কি করব? এখনো ত’ আলু
খোঁড়া হয়নি। কোন সুযোগই হলো না সে কাজের। আমাদের পড়শিরা দরজায় করাঘাত করছেন আর আমরা
পান করার জন্য বসে আছি। আমাদের সামনে পানীয় আর তখন পড়শিরা সবাই মিলে যৌথ খামারের চেয়ারম্যানকে
অভিশাপ দেওয়া শুরু করলো, ‘আমরা যাচ্ছি না, এটাই শেষ কথা। আগে বেঁচেছি যুদ্ধের ভেতর।
আর এখন তেজষ্ক্রিয়তার ভেতর। নিজেদেরকে কবর দিতে হলেও আমরা যাচ্ছি না!’
‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম যে আগামী দুই থেকে তিন মাসের ভেতর আমরা
মরতে যাচ্ছি। সেটাই তারা আমাদের বলেছে। তারা আমাদের কাছে প্রচার চালিয়েছে। আমাদের ভয়
দেখিয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমরা বেঁচে আছি।’
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!’
‘কেউ জানে না অন্য জগতে কি আছে। এখানেই বরং আমরা ভাল আছি। সবাই
চেনা-জানা মানুষ আমাদের।’
‘আমরা চলে যাচ্ছিলাম- মা’র কবর থেকে একমুঠো মাটি তুলে ছোট একটি
থলেতে পুরলাম। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে বললাম: ক্ষমা করো যে আমরা তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
সেখানে রাতে গেলাম এবং একটুও ভয় পাইনি। মানুষজন সব ঘরের উপরে তাদের নাম লিখছিল। বনের
গাছে। বেড়ার উপরে। আলকাতরার উপরে।’
‘সৈন্যরা কুকুরগুলো গুলি করে মেরে ফেলেছে। ওদেরকে গুলি করো।
বাহ্- বাহ্! এসবের পর আমি কোন জ্যান্ত প্রাণীর চীৎকার শুনতে পারিনা।’
‘আমি ছিলাম যৌথ খামারের একজন ব্রিগেড নেতা। পঁয়তাল্লিশ বছর
বয়স আমার। মানুষের জন্য আমার খারাপ লাগত। মস্কোতে আমরা আমাদের হরিণ নিয়ে গেছিলাম একটি
প্রদর্শনীতে দেখাতে। যৌথখামার থেকে আমাদের পাঠানো হয়েছিল। আমরা বদলে একটি আলপিন আর
একটা লাল রঙা সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরলাম। মানুষজন আমাকে সম্ভ্রম ভরে বলতো, ‘ভাসিলি নিকোলায়েভিচ,
নিকোলায়েভিচ।’ আর এখন আমি কে? একটি ছোট বাড়িতে থাকা একজন বৃদ্ধ মানুষ। এখানেই আমি মারা
যাব, নারীরা আমাকে খাবার জল এনে দেবে, ঘর গরম করবে। সব মানুষের জন্যই আমার খারাপ লাগে।
আমি নারীদের দেখেছি ক্ষেত থেকে রাতে গান গেতে গেতে ফিরতে। এবং আমি জানতাম তারা কোন
কিছু পাবে না। বরং বেতনের দিন কিছু লাঠির বাড়ি পাবে। তবু তারা গান গাইছে...’
‘যদি এই জায়গা তেজষ্ক্রিয়তায় বিষাচ্ছন্নও হয়ে থাকে, তবু এটা
আমার বাড়ি। অন্য কোন জায়গায় আমাদেরকে কারোর দরকার নেই। একটি পাখিও তার ঘরকে ভালবাসে।’
‘আমি আরো কথা বলব: আমি সাত তলায় আমার ছেলের সাথে বাস করতাম।
আমি জানালার কাছে এসে নিচের দিকে তাকাতম এবং কাঁধে আর কপালে ক্রুশ আঁকতাম। আমি ভেবেছিলাম
আমি একটি ঘোড়ার হ্রেষা শুনছি। একটি মোরগ। আমার সব কিছু খুব ভয়ানক লাগলো। কখনো কখনো
আমি আমার উঠোনটাকে স্বপ্নে দেখব: যেন বা উঠোনে আমার গাভিটির দুধ আমি দোয়াচ্ছি আর দুয়েই
চলছি। আমি জেগে উঠি। আমি ঘুম থেকে জাগি না। আমি এখনো সেখানে। কখনো আমি এখানে আর কখনো
সেখানে।’
‘দিনের বেলা আমি নতুন জায়গায় বাস করতাম আর রাতের বেলা বাড়িতে-
আমার স্বপ্নে তেমনটাই দেখতাম।’
‘শীতের দিনে রাতগুলো খুব দীর্ঘ হয়। আমরা কোথাও বসবো আর গুনব:
কে মারা গেল?’
‘আমার বর দু’মাস হয় শয্যাশায়ী ছিল। সে কোন কথা বলতো না, আমার
কথার উত্তর করতো না। সে ছিল উন্মাদ। আমি উঠানে ঘুরে-টুরে তাঁর কাছে ফিরে এসে বলতাম,
‘আজ কেমন লাগছে?’ কেউ যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তখন তার সামনে তোমার কাঁদা উচিত নয়। তার
মৃত্যুকে তোমার ঠেকানো উচিত, তাকেও বাঁচার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কাজেই আমি কাঁদতাম
না। শুধু একটি কথা রোজ বলতাম: ‘আমাদের মেয়ে আর আমার মা’কে শুভেচ্ছা জানাও।’ ঈশ্বরের
কাছে প্রার্থনা জানাতাম যেন বুড়ো-বুড়ি একসাথে মরতে পারি। ঈশ্বর এটা চাইলেই করতে পারতেন,
কিন্তু তিনি আমাকে মরতে দিলেন না। আমি বেঁচে
আছি...’
‘মেয়েরা! কেঁদো না। আমরা ছিলাম সব সময়ই ফ্রন্ট লাইনের সামনে।
আমরা ছিলাম স্তাখোনোভিৎস। আমরা স্ট্যালিন এবং যুদ্ধের সময়ের ভেতর দিয়েও বেঁচে থেকেছি!
আমি যদি না হাসতাম বা নিজেকে স্বান্তনা না দিতাম তবে কত আগে যে ফাঁসি ঝুলে আত্মহত্যা
করতাম।
“ঘর ছাড়ার আগে আমি গোটা ঘর ধুলাম, স্টোভ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে
পরিষ্কার করলাম। টেবিলের উপর রাখলাম খানিকটা রুটি, কিছুটা লবণ, একটি ছোট থালা এবং তিনটি
চামচ। বিয়েলোরুশিয়ায় আমাদের বিশ্বাস এই যে ঘর ছেড়ে কোথাও যাবার সময়, ঘরে যে কয়টি জীবিত
আত্মা আছে সেই কয়টি চামচ টেবিলে সাজিয়ে রাখতে হয়। যাতে সবাই একসাথে নিরাপদে আবার ঘরে
ফিরতে পারে।”
“তেজষ্ক্রিয়তায় আমাদের মোরগগুলোর ঝুঁটি আর লাল ছিল না। সব কালো
হয়ে গেছিল। চেরনোবিল দূর্ঘটনার পরে পনিরও বানানো
যাচ্ছিল না। একটি মাস আমরা পনির ছাড়া কাটিয়েছি। দুধ টক হতো না- তরল দুধ আণবিক তেজষ্ক্রিয়তায়
গুঁড়া দুধ, সাদা গুঁড়ায় পরিণত হয়েছিল।”
“আমার বাগানে তেজষ্ক্রিয়তা দেখা দিল। গোটা বাগানটা সাদা হয়ে
গেল, এত সাদা যেন কোন কিছু দিয়ে আবৃত। যেন বা এটি কোনকিছুর একটি টুকরো। ভাবলাম হতে
পারে কেউ অরণ্য থেকে এটি এনেছে (গোটা অঞ্চল জুড়েই এমনটি হতে দেখা গেছে এবং সম্ভবত:
বিষাক্ত তেজষ্ক্রিয়তার জন্যই এমনটি ঘটেছে)।”
“এত কিছুর পরও আমাদের বাড়ি ছাড়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। আমাদের
পুরুষেরা সব মদ খেয়ে মাতাল হচ্ছিলো আর নিজেদের গাড়ির নিচে ছুঁড়ে ফেলছিল। পার্টির বড়
নেতারা সবাই বাড়ি বাড়ি যাচ্ছিল আর মানুষজনকে মিনতি করছিল বাড়ি ছেড়ে দিতে। সেই সাথে
নির্দেশও ছিল বৈকি: ‘আপনাদের জিনিষপত্র সাথে নেবেন না।’
“তিন দিন হয় আমাদের গবাদি পশুরা এক ফোঁটা জল পায়নি খেতে। কোন
খাবারও ছিল না তাদের। এই যা! এক প্রতিবেদক হলো সংবাদপত্র থেকে। মাতাল গোয়ালিনীরা তাকে
প্রায় খুন করে আর কি!”
“পার্টির প্রধান তার সৈন্যদের সাথে নিয়ে আমার বাড়ির চারপাশে
হাঁটছেন। আমাকে ভয় দেখারও চেষ্টা করছিলেন: ‘বের হয়ে আসো নয়তো আমরা তোমাদের বের করে
দেব! ছেলেরা! আমাকে গ্যাসের ক্যানটা দাও ত’!’ আমি তখন একটি কম্বল আর একটি বালিশ কোনমতে
হাতে চেপে দৌড়াচ্ছিলাম।”
“যুদ্ধের সময় সারা রাত হাতুড়ির শব্দের মত বন্দুকের গুলির আওয়াজ
শোনা যায়। বনের ভেতর আমরা একটা গর্ত খুঁড়েছিলাম। ওরা বোমা ফেলবে আর ফেলবে। সব কিছু
পুড়িয়ে ফেলেছিল- শুধু ঘর নয়, বরং বাগান, চেরি গাছ, সব কিছু। যতক্ষণ না যুদ্ধ বিরতি
হয়। এই সবকিছু নিয়েই ভয়ে থাকি।’
“ওরা আর্মেনীয় ব্রডকাস্টারকে বললো: এখানে কি চেরনোবিল আপেল
আছে?’
‘অবশ্যই পাবেন। তবে আপেল খাবার পর এর শাঁসটুকু মাটির অনেক গভীরে
প্রোথিত করতে হবে।’
‘তারা আমাদের একটি নতুন ঘর দিয়েছে। পাথরের তৈরি। কিন্তু
আপনি জানেন, গত সাত বছরে
আমরা একটি পেরেকও ঠুকি নি সে বাড়িতে। এই বাড়ি ত’ আমাদের নয়। এ যেন বিদেশী কোন ঘর। আমার
স্বামী শুধু কাঁদত। সারাটা সপ্তাহ সে একটি ট্রাক্টরে বসে কাজ করে, রবিবারের জন্য অপেক্ষা
করে আর রবিবার এলে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে সে বিলাপ করে।’
“আমাদের আর কেউ বোকা বানাতে পারবেনা। আমরা কোথাও যাচ্ছি না।
এখানে কোন গুদামঘর নেই, কোন হাসপাতালও নেই। আমরা কেরোসিন বাতির কাছে বসে আছি। চাঁদের
আলোর নিচে। আর সেটাই করতে ভাল লাগছে। যেহেতু এখানেই আমাদের দীর্ঘ দিনের বসতি।”
‘শহরে আমার পুত্রবধূ গোটা এ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে আমার চারপাশে
সবসময় আমাকে ছায়ার মত অনুসরণ করেছে। দরজার হাতল আর চেয়ার মুছে রেখেছে। কিন্তু
এই আসবাব-পত্র এবং ঝিগুলি
গাড়ি সবটাই টাকা দিয়ে কেনা। সরকার আমাকে আমার গাড়ির বাড়ি এবং গরুর বদলে শহরে এই এ্যাপার্টমেন্ট
আর টাকা দিয়েছে। কিন্তু যেই আমার ক্ষতিপূরণের টাকা শেষ হয়ে যাবে, অর্থাৎ ছেলে আর ছেলের বউয়ের কাছে
আমার দরকার ফুরিয়ে যাবে।’
‘ছেলে-মেয়েরা আমাদের টাকা নিয়ে নিলো। মুদ্রাস্ফীতিতে খরচ হলো
বাকিটা। আমাদের নতুন করে ঘর বানাতে যে টাকা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ তা’ দিয়ে এক বাক্স ভাল
চকোলেট কেনা যায়। দূর্ঘটনার পর তল্লাট ছেড়ে দু’সপ্তাহ হেঁটেছি। আমার সাথে ছিল আমার
গরুটা। কর্তৃপক্ষ ত’ আমাকে ঘরেই ঢুকতে দেবে না। তখন বনে ঘুমিয়েছি।’
‘ওরা আমাদের ভয় পায়। ওরা বলে আমরা নাকি সংক্রামক। কেন ঈশ্বর
আমাদের এত বড় শাস্তি দিলেন? তিনি কি উন্মাদ? আমরা ত’ আর সব মানুষের মত থাকি না। আমরা
ঈশ্বরের বিধান অনুযায়ী চলি না। সেজন্যই আজ পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে মারছে।’
‘আমার ভাইয়ের নাতিরা প্রতি গ্রীষ্মে আমাদের কাছে বেড়াতে আসে।
তবে চেরনোবিলের ঘটনা যেবার ঘটলো, সেবারই প্রথম তারা এলো না। খুব ভয় পেয়েছিল ওরা। তবে
এখন ওরা আবার আসছে। খাবার বা যা কিছু ওদের দাও না কেন, ওরা সেটা নেয়। ‘দিদা,’ ওরা বলে,
‘তুমি কি রবিনসন ক্রুসোর বইটা পড়েছো? রবিনসন ক্রুসো আমাদের মতই একা একা থাকতো। আমাদের
মতই তার চারপাশে কোন প্রতিবেশী ছিল না। আমি আমার সাথে আধা বাক্স দেশলাই এনেছি। সাথে
একটি কুড়াল আর বেলচা। আর এখন আমার কাছে আছে শুকরের চর্বি, ডিম আর দুধ- এসবই আমার। শুধুমাত্র
চিনি- এটা ত’ তুমি গাছ লাগাতে পারো না। তবে জমি যা প্রয়োজন তা’ সবই আমাদের আছে। তুমি
যদি চাও তবে ১০০ হেক্টর পর্যন্ত জমি চাষ করতে পারো। এবং কোন সরকার বা উর্দ্ধতন নয়।
কেউ তোমার পথে বাঁধা হবে না।’
‘বেড়ালেরাও আমাদের সাথে ফিরে এলো। কুকুরেরাও। আমরা সবাই একসাথে
ফিরে এলাম। সৈন্যরা আমাদের ঢুকতে দিতে চায় নি। দাঙ্গা দমন বাহিনীর সৈন্যরা। রাতে পার্টিজানদের
মত বনের ভেতরে থেকেছি।’
‘সরকার থেকে আমাদের কিছু দেবার দরকার নেই। আমাদের একা থাকতে
দিলেই যথেষ্ট। সেটুকুই শুধু চাই আমরা। আমাদের কোন স্টোর দরকার নেই। কোন বাসও না। রুটি
পেতে আমাদের হাঁটতে হয়। কুড়ি কিলোমিটার হাঁটতে হয়। আমাদের ছেড়ে দাও। আমরা নিজেরা নিজেরাই
যথেষ্ট।’
‘আমরা একসাথে ফিরে এসেছিলাম। তিনটি পরিবারের মানুষ মিলে। এসে
দেখি যেভাবে আমরা আমাদের ঘর-বাড়ি রেখে গেছিলাম তার অনেক কিছুই নেই। সবকিছু লুট হয়েছে:
উনুন তছনছ, জানালাগুলো আর ওরা দরজাও নিয়ে নিয়েছে। বাতি, বৈদ্যুতিক বাতির সুইচ- লুটেরারা
সবকিছু লুট করেছে। কিচ্ছু রাখেনি। এই হাত দু’টোর সাহায্যে সব কিছু আমি আবার আগের শৃঙ্খলায়
ফিরিয়ে নিয়েছি। এছাড়া আর কি বা করার ছিল?’
“বুনো হাঁসেরা যখন চীৎকার করে, তখন বুঝতে হবে যে বসন্ত এসেছে।
জমিতে বীজ বোনার সময়। আর আমরা খালি ঘরে বসে আছি। অন্তত: ঘরের ছাদ ত’ মজবুত।”
“পুলিশ সমানে চেঁচাচ্ছিল।
তারা গাড়িতে করে আসবে আর আমরা জঙ্গলে পালাবো। ঠিক যেমন জার্মানদের দেখলে পালাতাম।
কখনো কখনো তারা উকিল সাথে করে নিয়ে আসবে যে আমাদের ধারা ১০ শেখাবে আর হাঁফাতে হাঁফাতে
বলবে: ‘তাদেরকে আমায় এক বছরের জন্য জেলে পাঠাতে দাও। আমি কয়েদ খেটে এসে আবার এখানে
ফিরব।’ আসলে পুলিশের কাজ হলো চেঁচানো আর আমাদের কাজ চুপ থাকা। আমার একটা পদক আছে- কোলখোজের
সেরা কৃষক আমি। আর এই উকিল কিনা আমাকে ধারা-১০ শেখাতে চায়।”
“প্রতিদিন আমি আমার ঘরের স্বপ্ন দেখি। আমি ঘরে ফিরছি: বাগানে
কাজ করছি অথবা আমার শয্যা প্রস্তত করছি। আর প্রতিদিনই আমি নতুন কিছু পাচ্ছি: একটি জুতা
অথবা একটি ছোট মুরগীর বাচ্চা। আর সবকিছুতেই যেন ভাল কিছু হচ্ছে। এটা আমাকে সুখী করেছিল।
আমি দ্রুতই ঘরে ফিরব।’...
“রাতে আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আর দিনে করি পুলিশের
কাছে। তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করো, ‘কাঁদছো কেন?’ তবে আমি বলব যে জানি না কেন কাঁদছি।
নিজের ঘরে থাকতে পেরে আমি খুশি।’
‘আমরা সবকিছুর ভেতর দিয়ে বেঁচেছি, সব কিছু সয়েছি।’...
‘আমি এক ডাক্তারকে দেখতে ঢুকলাম। মিষ্টি মেয়ে, আমি ডাক্তারকে
বললাম, আমার পা জোড়া যেন আর চলতে চায় না। হাঁটুতে টান লাগে।’ আপনি আপনার গরুটা ছেড়ে
দিন দিদা! ঐ গরুর দুধ এখন বিষাক্ত আর তেজষ্ক্রিয়তা যুক্ত।’ ‘না- না- আমার পা ব্যথা
হোক আর হাঁটু ব্যথা হোক আমি গরু ছাড়তে পারব না।’
‘আমার সাতটি ছেলে-মেয়ে। ওরা সবাই শহরে বাস করে। আমি এখানে একা।
প্রায়ই খুব নি:সঙ্গ লাগে আমার। আমি ওদের ফটোগ্রাফগুলোর নিচে বসব। অল্প সময় কথা বলব।একা
একাই কথা বলব। আমি নিজে নিজেই আমার ঘরটি এঁকেছি। ছয় ক্যান রং লেগেছে ঘরটি আঁকতে। আর
এভাবেই আমি বাঁচি। চার ছেলে আর তিন মেয়েকে আমি বড় করে তুলেছি। আমার স্বামী অল্প বয়সেই
মারা গেছেন। এখন আমি একা।’
‘আমি একবার একটি নেকড়েকে দেখেছিলাম। সে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমিও সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমরা এ ওকে চেয়ে দেখছিলাম। সে রাস্তার দিকে যখন এগিয়ে আসতে
থাকল, আমি দিলাম দৌড়। আমার চুল খাড়া হয়ে গেল আর মাথার টুপিটাও যেন ভয়েই উঁচু হয়ে উঠলো।
এত ভয় পেয়েছিলাম!’
“যে কোন পশুই মানুষকে ভয় পায়। আপনি যদি তাকে স্পর্শ না করেন,
সে আপনার চারপাশে হাঁটতে থাকবে। আবার একইভাবে দিনের পর দিনে অরণ্যে থেকে অভ্যস্ত হয়ে
গেলে মানুষের গলার স্বর শুনে আপনি তার কাছে দৌড়ে যাবেন। আজকের দিনে মানুষ এ ওর থেকে
লুকিয়ে থাকে। ঈশ্বর আমাকে অরণ্যে কোন মানুষের মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন।’
“বাইবেলে যা কিছু লেখা হয়েছে তা’ সবই সত্যি ফলে যাচ্ছে। আমাদের
যৌথ খামার সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে। এবং গর্বাচেভ সম্পর্কেও। যেমন দ্যাখো বাইবেলে
বলেছে যে একটি জন্মচিহ্ন সহ এক বড় নেতা আসবেন এবং তখন এক বৃহৎ রাজ্যের ধসে পড়া শুরু
হবে। আর তারপর আসবে শেষ বিচারের দিন। শহরে যারা থাকবে তারা সবাই মরে যাবে। শুধুমাত্র
গ্রামের একজন মানুষ বাঁচবে। এই ব্যক্তি কোন মানুষের পায়ের ছাপ দেখতে পেলেই খুশি হবে।’
‘আমাদের আলো রাখার জন্য পিলসুজ আছে। একটি কেরোসিনের বাতি। আহা।
একজন নারী ইতোমধ্যেই তোমাকে বলেছে। আমরা যদি একটি বুনো শুকর মারি, তবে আমরা শুকরটি
বেজমেন্টে বা পাতালে নিয়ে যাই অথবা শুকরটি মাটি চাপা দিয়ে কবর দিই। মাটির নিচে দু/তিন
দিন অন্তত: মাংস ভাল থাকে আর হয়তো তেজষ্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয় না । নিজেরাই ভদকা বানাই।’
“আমাদের দু’ব্যাগ লবণ আছে। সরকারের কি দরকার? প্রচুর কাঠ আছে-
আমাদের চারপাশে গোটা একটি অরণ্য আছে। ঘরটি গরম। পিদিম জ্বলছে। দারুণ। আমার একটি ছাগল,
একটি বাচ্চা, তিনটি শুকর, চোদ্দটি মুরগী আছে। জমি- যতটা দরকার ততটা পাই। ঘাস- যতটা
দরকার ততটা। কুয়োয় জল আছে। আছে স্বাধীণতা বা মুক্তি। আমরা সুখী।
এটা আর যৌথ খামার নয় এখন। এটি একটি কমিউন। আমাদের আর একটি ঘোড়া
কেনা দরকার। আর তারপর কাউকেই দরকার হবে না।’
এক প্রতিবেদক বললো আমরা দূর্ঘটনার পর পালিয়ে গিয়ে আবার যে ফিরে
এসেছি এটা শুধু ঘরে ফেরা নয়। আমরা একশ বছর পেছনে চলে গেছিলাম। আমরা এখন ফসল তুলতে হাতুড়ি
আর জমি নিড়াতে কাস্তে ব্যবহার করি। আলকাতরার মত ছাইয়ের উপর গম মাড়াই করি।
‘যুদ্ধের সময় আমাদের মানুষদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তখন মাটির
নিচে থেকেছি আমরা, বাঙ্কারে। ওরা আমার দুই ভাই আর দুই ভাইয়ের ছেলেকে পুড়িয়ে মেরেছে।
আমাদের পরিবারের ১৭ জন শহীদ হয়েছে এক দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে। আমার মা জীবনভর শুধু কেঁদেছে।
আমাদের গ্রামে এক বুড়ি ছিল যে গ্রামের পর গ্রাম আবর্জনা খুঁটে বেড়াতো। সে আমার মা’কে
বলতো, ‘তুমি কাঁদছো? শোক করছো? শোক করো না। যে তার জীবন অন্যদের জন্য বিলিয়ে দেয়, সেই
মানুষ সদা পবিত্র।’
‘চেরনোবিল যেন যুদ্ধের চেয়েও বড় যুদ্ধ। কোথাও কোন লুকনোর জায়গা
নেই। মাটির নিচে না, জলের নিচে না কিম্বা বাতাসেও না।’
‘আমরা আর বেতার শুনি না। নতুন কোন খবর জানি না, তবে জীবন এখন
শান্ত। মানুষজন আসে, তারা আমাদের গল্প বলে- সর্বত্র যুদ্ধ। এবং সমাজতন্ত্র শেষ আর আমরা
পুঁজিবাদের আওতায় বাস করছি। জার আবার ফিরবেন। এটা কি সত্যি? ’
‘উদ্যানে কখনো আসবে বুনো শুকর। কখনো আসবে খেঁকশিয়াল। কিন্তু
মানুষ আসবে কদাচিৎ। শুধু
পুলিশ আসবে।’
‘আমার বাসাটাও একবার দেখে যান।’
‘আমারটাও। অতিথিরা চলে গেছে।’
‘আমি ক্রুশ চিহ্ন আঁকি আর প্রার্থনা করি: প্রিয় ঈশ্বর! দু’বার
পুলিশ এসে আমার চুলা ভেঙ্গে গেছে। তারা আমাকে একটি ট্রাক্টরে তুলে নিয়েছে। এবং তারপরও
আমি ফিরে এসেছি। ওদের উচিত মানুষকে তাদের ভিটে-মাটিতে ফিরতে দেয়া। অনুমতি দিলে সবাই
হাঁটুর উপর গড়িয়ে গড়িয়ে হলেও ফিরবে। আমাদের দু:খ ওরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। এখন
শুধুমাত্র মৃতরাই ফিরে আসে। মৃতরা অনুমিত পেয়েছে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু
জীবিতরা শুধুমাত্র রাতে
ফিরে আসবে, অরণ্যের ভেতর দিয়ে।’
‘প্রত্যেকে ফসল তোলার জন্য ফিরতে চাচ্ছে। সবাই দিনের শেষে যে
যার পিঠ বাঁচাতে চায়। চেরনোবিলের আশপাশে বাস করে এমন অধিবাসীদের ভেতর যাদের পুলিশ ফিরতে
দেবে তাদের নামের লিস্ট পুলিশের কাছে আছে। তবে আঠারোর নিচে শিশুরা আসতে পারবে না। তাদের
জন্য তেজষ্ক্রিয়তা আরো খারাপ হবে। সবাই বাড়ি ফিরবে বা ফিরতে পারবে এই আনন্দে অধীর হয়ে
উঠলো। বাড়ির উঠোনে আপেল গাছটার কাছে তারা দাঁড়াবে। প্রথমে তারা পারিবারিক কবরস্থানে
গিয়ে কাঁদবে, তারপর যাবে নিজেদের উঠানে। সেখানেও তারা কাঁদবে আর প্রার্থনা করবে। মোমবাতি
রাখবে কবরখানায়। কবরের বেড়া ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে অনেকক্ষণ। কখনো কখনো ঘরে তারা রাখবে
একটি ফুলের তোড়া। আর দরজায় একটি সাদা তোয়ালে। এক বৃদ্ধা হয়তো প্রার্থনা পড়বেন: ‘ভাই
ও বোনেরা! ধৈর্য্য রাখো!’
‘শুধুমাত্র রাতের বেলায় আমি কাঁদি না। মৃতদের জন্য রাতের বেলা
কাঁদা যায় না। সূর্য অস্ত গেলে আমি কান্না থামিয়ে দিই। ওদের আত্মাগুলোর কথা স্মরণে
রেখো, হে ঈশ্বর! আর তাঁদের স্বর্গরাজ্যকে আসতে দাও।’
‘তুমি যদি না খেলো তবে তুমি হেরে যাও। বাজারে এক উক্রাইনীয়
নারী ছিলেন যিনি বড় বড় লাল আপেল বিক্রি করতেন। এসো- আপেল নিয়ে যাও! চেরনোবিল আপেল!
কেউ কেউ তাকে বুদ্ধি দিল যেন ‘চেরনোবিলে’র কথা বলে আপেল বিক্রি না করে। তাহলে কেউ কিনবে
না। ভয় পেও না! সে বললো, ওরা আপেল কিনে নেয়। কারো কারো তার শাশুড়ির জন্য আর কারো কারো
তার অফিসের উর্দ্ধতন কর্মকর্তার জন্য আপেল ত’ কিনতেই হয়।’
‘এখানে একজন ছিল যে জেল থেকে ফিরে এসেছিল। বিশেষ দয়ায়। সে আমাদের
পাশের গ্রামেই বাস করতো। তাঁর মা মারা গেছিলেন। গোটা বাড়িটাই মাটির নিচে চাপা দেয়া
হয়েছিল। তিনি আমার কাছে এসে বললেন, ‘ভদ্রমহোদয়া, আমাকে দয়া করে খানিকটা রুটি আর একটু
শুকরের চর্বি দেন। আমি আপনার জন্য কাঠ কাটবো।’ তা’ তাকে দিলাম তখন খানিকটা রুটি আর
শুকরের চর্বি।’
‘গোটা দেশটার অবস্থা যাচ্ছেতাই- সব এলোমেলো আর তার ভেতরেই মানুষজন
ছেড়ে যাওয়া গ্রামে ফিরে আসছে। অন্যদের কাছ থেকে তারা পালিয়ে বেড়ায়। আইনের হাত থেকেও।
ওরা নিজেদের মত থাকে। এমনকি আগন্তকেরাও। কঠোর তাদের হাবভাব। চাহনিতে কোন বন্ধুত্বের
ছাপ নেই। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে তারা এটা-সেটা পোড়ায়। রাতের ফেলা আমরা বিছানার নিচে কুঠার
আর ত্রিশুল নিয়ে ঘুমাই। দরজার কাছে রান্নাঘরে একটি হাতুড়ি।’
‘বসন্তকালে এখানে একটি জলাতঙ্কগ্রস্থ শেয়াল ছিল- জলাতঙ্ক রোগ
হলে ওরা খুব বন্ধুর মত ব্যবহার করে, খুবই বন্ধুর মত ব্যবহার করে। তবে জলের দিকে তাকাতে
পারে না। তোমার উঠোনে শুধু এক বালতি জল রেখে দিও। আর তাহলেই দিব্যি কেটে যাবে। শেয়ালটি
দৌড়ে পালাবে।’
‘এখানে কোন টিভি নেই। সিনেমা নেই। একটা কাজই করার আছে- সারাদিন
জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে থাকা। আর প্রার্থনা করা। আগে ঈশ্বরের বদলে সমাজতন্ত্র ছিল।
এখন শুধু সমাজতন্ত্র আছে। সুতরাং আমরা প্রার্থনা করি।’
‘আমরা সেই সব মানুষ যারা আমাদের যৌবনে দেশকে সেবা করেছি। আমি
ত’ পার্টিজান ছিলাম। এক বছর পার্টিজান হিসেবে কাজ করেছি। আমরা জার্মানদের যুদ্ধে হারিয়েছি।
রাইখস্ট্যাগের দেয়ালে আমি আমার নাম লিখেছি: আর্ত্যুশেঙ্কো। সমাজতন্ত্রের জন্য আমি আমার
পিঠ থেকে শার্টটি পর্যন্ত খুলে দিয়েছি। আজ সেই সমাজতন্ত্র কোথায়?’
‘এখানে আমাদের রয়েছে সাম্যবাদের সেরা নিদর্শন- সবাই আমরা ভাই-বোনের
মত বাস করি...’
‘যেবছর যুদ্ধ শুরু হলো, সেবছর চারপাশে কোন ব্যাঙের ছাতা বা
বেরি ফল পাওয়া যাচ্ছিল না। কেমন অবিশ্বাস্য শুনতে, তাই না? পৃথিবী নিজেই যেন আসন্ন
দূর্যোগ টের পাচ্ছিল। আহ, পুরণো দিনের কথা সব কেমন মনে পড়ে! আমি কখনোই যুদ্ধকে ভুলি
নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় একটা গুজব শোনা গেছিল যে রাশিয়ার সব যুদ্ধবন্দীকে ফিরিয়ে
আনা হবে। যদি কেউ তার প্রিয়জনকে এতদিন পরেও সণাক্ত করতে পারে তবে তাকে আনা হবে। আমাদের
গ্রামের সব বয়সী নারীরা দৌড়ালো। সেই রাতে কেউ বাড়িতে তাদের পুরুষকে নিয়ে ফিরলো। কেউ
আবার ভুলে অন্য পুরুষ নিয়ে ফিরলো। কিন্তু সেখানে ছিল এক বদমাশ...সে অন্যদের
মতই সাধারণ জীবন যাপন করত। বিবাহিত ছিল আর দুই বাচ্চা ছিল তার। সে কম্যান্ডান্টকে বললো
আমরা একজন উক্রানীয়কে ধরে এনেছি যে আসলে আমাদের গ্রামের নয়। সেখানে ছিল ভাস্কো, সাশকো
সহ আরো অনেকে। পরের দিন জার্মানরা মটর সাইকেলে চড়ে এলো। আমরা তাদের কাছে কত দয়া ভিক্ষা
করলাম। হাঁটু গেড়ে বসে মিনতি করলাম। কিন্তু জার্মানরা তাদের ধরে গ্রামের বাইরে
নিয়ে গেল আর স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে ওদের গুলি করলো। নয়/নয় জন মানুষ। সবাই তারা বয়সে
ছিল নবীন আর কি ভাল প্রত্যেকে! ভাস্কো, সাশকো...’
‘জার্মানদের অধিনায়ক লোকটাও এসেছিল। সমানে চিৎকার করছিল তারা।
কিন্তু আমরা যেন
ছিলাম বোবা। আমরা সব কিছুর ভেতর দিয়ে বেঁচেছি। সব কিছুর ভেতর দিয়ে রক্ষা পেয়েছি...’
‘আমি কারোর ভয়ে ভীত নই- মৃতদের ভয়ে নয়, বুনো জন্তÍর ভয়ে নয়,
কারো ভয়েই ভীত নই। আমার ছেলে শহর থেকে এসে আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে পাগলের মত করে,
‘তুমি কেন এই বিরান জায়গায় পড়ে থাকো? যদি কোন লুটপাটকারী এসে তোমাকে খুন করে?’ কিন্তু সে আমার কাছ থেকে কি পাবে? আছে কিছু
বালিশ। একটি সাদা-মাটা ঘরে আসবাব-পত্র বলতে ঐ গোটা কয়েক বালিশ। যদি কোন চোর ঢোকার চেষ্টা
করে, তবে জানালা থেকে মাথা গলানোর চেষ্টা করা মাত্র আমি কুড়–ল দিয়ে তার মাথাটা কাটবো
সবার আগে। এভাবেই আমরা এখানে কাজ করি। হতে পারে ঈশ্বর নেই এখানে অথবা কেউ একজন আছেন
তবে কেউ না কেউ উপরে অবশ্যই আছেন। এবং আমি জীবিত।’
‘চেরনোবিল এমন ভেঙ্গে পড়লো কেন? কেউ কেউ বলে এসব নাকি বিজ্ঞানীদের
ভুল। তারা ঈশ্বরের দাড়ি ধরে নেড়েছিল আর তাই ঈশ্বর এখন হাসছেন। তবে আমরা সাধারণ মানুষ
দাম চুকিয়ে যাচ্ছি।’
‘আমরা কেউ কখনো ভাল ভাবে বাঁচিনি। কিম্বা শান্তিতে। সারা জীবন
ভয়ে কাটিয়েছি। যুদ্ধের আগে ওরা মানুষজনকে ধরে নিত। কালো গাড়িতে চড়ে এসে আমাদের দু/তিন
জন পুরুষকে ধরে নিয়ে যেত ক্ষেতে। সেই পুরুষেরা আজো ফেরেনি। আমরা সদা ভীত।’
‘তবে এখন আমরা মুক্ত। ভাল ফসল হয়েছে। আমরা এখন রাজার হালে আছি।’
‘এখানে আমাদের যা হয়েছে তা’ যুদ্ধের উপর যুদ্ধ- চেরনোবিল।’
‘অথচ কোকিল কুহু ডাক ডাকছে- দোয়েল কিচির মিচির করছে, বুনো হরিণ
দৌড়াচ্ছে। ওরা কি আর সন্তানের জন্ম দিতে পারবে? কে জানে? বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখি
বুনো শুকর মাটি খুঁড়ছে। কত বুনো প্রাণী ছিল আমাদের! মানুষকে পুনর্বার ফিরিয়ে এনে বসতি
স্থাপন করা যায় কিন্তু এলক
বা বুনো শুকরকে- ফিরিয়ে আনা যায় না।’ আর জল কোন সীমান্ত রেখা মানে না- পৃথিবী জুড়ে
বা মৃত্তিকার নিচ থেকেও সে বয়ে চলে।’
‘বুকে বড় ব্যথা লাগে মেয়েরা! বড় কষ্ট হয়। বরং আমরা চুপ করে
যাই। তারা তোমার কফিন নীরবে বয়ে আনে। সতর্ক থাকো। দরজা বা বিছানায় আঘাত করো না, কোন
কিছু স্পর্শ করো না বা করাঘাত করো না। নয়তো পরবর্তী মৃত মানুষটির জন্য তোমাকে অপেক্ষা
করতে হবে। তাদের আত্মাকে স্মরণ করো, হে ঈশ্বর! তাঁদের স্বর্গরাজ্য ধরণীতে অবতরন হোক।
যেখানে তারা শায়িত সেখানে তাদের জন্য প্রার্থনা মন্ত্র উচ্চারিত হোক। এখানে আমাদের
বাড়ি ফিরে মানুষজন সবাই ডিম, রোল আর যে যা খাবার পারে সেসব
নিয়ে যাচ্ছে কবরখানায়। প্রত্যেকে পরিবারের সাথে মিলে বসেছে আর কবরখানায় শায়িতদের বলছে,
‘বোন, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি। দুপুরের খাবার খাও।’ অথবা ‘মা, প্রিয় মা, বাবা, প্রিয়
বাবা!’ যাদের কাছের মানুষেরা এবছর মারা গেছে তারা কাঁদলো। যাদের প্রিয়জনেরা আগের বছর
মারা গেছে তারা কাঁদলো না। সবাই কথা বলছে আর স্মরণ করছে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াদের। প্রত্যেকে
প্রার্থনা করছে। যারা জানে না কিভাবে প্রার্থনা করে তারাও করছে। এখানে আমাদের সবকিছু
আছে- কবরস্থান। সর্বত্র কবর। ময়লা গাদা করে ফেলার ট্রাকগুলো কাজ করছে, বুলডোজারগুলো।
ঘরগুলো পড়ো পড়ো। গোরখোদকরা দিনরাত কাজ করছে। তারা স্কুলগুলো, অফিস-আদালত, স্নানাগার সহ সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়েছে মাটিতে। সেই একই পৃথিবী শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে। একটা জিনিষ
জানি না, মানুষের কি আত্মা আছে? থাকলে সে আত্মা কেমন? তারা সবাই পরবর্তী জীবনে কি খাপ
খাওয়াতে পারবে?’
‘এক বৃদ্ধা নারী, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আমরা অমর।
আমরা প্রার্থনা করি। হে ঈশ্বর, আমাদের শক্তি দাও যেন আমরা এই পার্থিব জীবনের সব ক্লান্তি
আর জরাজীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারি।’
জীবিতদের ভূমি
পুরণো
ভবিষ্যদ্বানী
বিষয়ক একাকী সংলাপ
আমার ছোট মেয়ে- সে খানিকটা আলাদা অন্যদের চেয়ে। আর দশজনার মত
একেবারেই নয়। সে ত’ দ্রুতই বড় হয়ে উঠবে আর আমাকে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কেন আমি অন্যদের মত
নই?’
ও যখন জন্মালো, তখন যেন কোন বাচ্চা নয়। বরং একটি ছোট থলে যার
সবটা জায়গা সেলাই করা। শরীরের কোন একটি জায়গা খোলা বা সেলাই ছাড়া না, শুধু চোখ দু’টো
ছাড়া। মেডিক্যাল কার্ডে ওর সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘মেয়ে শিশু, বিভিন্ন ধরণের জটিল সমস্যা
নিয়ে জন্ম: মলদ্বারে জন্মগত ত্রুটি, যোনীর জন্মগত ত্রুটি এবং বাম কিডনীর জন্মগত ত্রুটি
নিয়ে ও জন্মেছে।’ ডাক্তারি পরিভাষায় এমনটি শোনালেও এর সোজা অর্থ আরো পরিষ্কার: হিসু
করার জায়গা নেই, হাগু করার জায়গা নেই এবং একটি মাত্র কিডনী। দ্বিতীয় দিনে আমি দেখলাম
ওকে অপারেশন করা হলো- মাত্রই তার জীবনের দ্বিতীয় দিনেই শল্য চিকিৎসার মুখোমুখি হল আমার
ছোট মেয়েটি। ও ওর চোখ খুলে হাসলো। আমি ভেবেছিলাম এই বুঝি কান্না শুরু করবে। না, হে
ঈশ্বর, ও বরং হাসলো!
চেরনোবিলের ঘটনার পর ওর মতো যে শিশুরাই জন্মেছে তারা কেউই বাঁচে
নি। তবে আমি কিনা আমার মেয়েটিকে এত ভালবাসতাম যে সে বেঁচে রইলো।
পরের চার বছরে ওর চারটি অপারেশন হলো। গোটা বেলারুশে ও-ই একমাত্র
বাচ্চা যে এত জটিল সব সমস্যা নিয়ে জন্মেও বেঁচে থেকেছে। আমি এত ভালবাসি আমার মেয়েটাকে
(স্তব্ধতা)। আমি আর সন্তান জন্ম দিতে পারব না। সাহসই হবে না আর গর্ভধারণ করার। হাসপাতালের
মাতৃত্ব ওয়ার্ড থেকে বাড়ি ফিরবার পর আমার স্বামী যখন আমাকে চুম্বন করতে শুরু করলো,
তখন শায়িত অবস্থায় কাঁপা শুরু করলাম: ‘আমরা আর পরষ্পরকে ভালবাসতে পারি না, তাহলে আবার
এমন অসুস্থ শিশু জন্ম নেবে। একটি অসুস্থ শিশু পৃথিবীতে আনা হলো পাপ, আমার ভয় করছে।’
ডাক্তারকে আমি বলতে শুনেছি: ‘এই বাচ্চা মেয়েটি কোন শার্টের উপর জন্মায় নি। ও জন্মেছে
লোহার বর্মের উপর। কত সাধ্য সাধনা করেই না ওকে পৃথিবীতে আনতে হয়েছে!’ এসব শোনার পর
আর কিভাবে আমার স্বামীকে আমি ভালবাসব?
আমি চার্চে গেলাম এবং পাদ্রির সাথে দেখা করলাম। তিনি বললেন
আমার পাপ মোচনের জন্য প্রার্থনা করা উচিত। কিন্তু আমার পরিবারে কেউ কাউকে কখনো খুন করেনি। আমার কি অপরাধ
আছে? প্রথমে ওরা চাইলো আমরা সবাই আমাদের গ্রাম খালি করে দিই, আর তারপর তারা তালিকায়
ক্রস চিহ্ন এঁকে দিল- সরকারের যথেষ্ট টাকা ছিল না। আর সেই সময়েই আমি প্রেমে পড়ি আর
বিয়ে করি। আমি জানতাম না যে এই তেজষ্ক্রিয়তা দুষ্ট এলাকায় নর-নারীর পরষ্পরকে ভালবাসা
উচিত নয়। বহু বছর আগে আমার দিদা বাইবেল পড়ে শোনাতেন যেখানে এমন একটি সময় পৃথিবীতে আসবে
বলে বলা হয়েছে যখন চারপাশের সবকিছুই খুব জীবন্ত হবে, ফুল ফুটছে আর গাছে গাছে ধরছে ফল,
নদীতে অনেক মাছ আর অরণ্যে পশু-পাখি আছে তবু মানুষ এসবের কোনটাই ব্যবহার করতে পারবে
না। এমনকি সে তার বংশবিস্তারও করতে পারবে না। এই সব দৈব বাণী শুনতাম যেন কোন অশুভ রূপকথা
শুনছি। এসবে আমার বিশ্বাস ছিল না।
সবাইকে আমার মেয়ের সম্পর্কে বলো। এটা লেখো কাগজের পাতায়। ওর
বয়স চার বছর আর ও গান গায়, নাচে এবং কবিতা মুখস্থ বলতে পারে। ওর মানসিক বিকাশও স্বাভাবিক।
অন্য বাচ্চাদের থেকে ও একটুও আলাদা নয়। শুধু ওর খেলাগুলো আলাদা। অন্য বাচ্চারা যখন
‘দোকান’ বা ‘স্কুল’ নিয়ে গেম খেলে, ও তখন খেলে ‘হাসপাতাল’ নিয়ে। ও ওর পুতুলগুলোকে ইঞ্জেকশন
দেয়, থার্মোমিটার দিয়ে তাদের জ্বর মাপে, পুতুলগুলোর হাতের শিরায় ইন্ট্রাভেনাস স্যালাইন
দেয়। কোন পুতুল মারা গেলে মেয়েটি আমাদের তাকে সাদা চাদর দিয়ে ঢাকে। গত চার বছর ধরে
আমরা ওর সাথে হাসপাতালে বসবাস করছি। আমরা ত’ সেখানে তাকে একা রাখতে পারি না। আর ও জানেও
না যে হাসপাতাল নয়, মানুষের থাকার জায়গা হলো বাসা। আমরা যদি কখনো এক বা দু’মাসের জন্য
বাসায় ফিরি, ও তখন জিজ্ঞাসা করে, ‘আমরা হাসপাতালে ফিরব কখন?’ হাসপাতালেই ওর বন্ধু ওরই
মতো অসুস্থ বাচ্চারা রয়েছে। সবাই মিলে একসাথে থাকে।
ডাক্তাররা ওর শরীরে সার্জারির মাধ্যমে একটি মলদ্বার তৈরি করেছে।
ডাক্তাররা ওর দেহে একটি যোনীও তৈরি করছে। শেষ অপারেশনের পর ওর মূত্র নি:সরণ ব্যবস্থা
একদম ভেঙ্গে পড়েছিল। আবার ক্যাথিটারও ঢোকানো যাচ্ছিল না- ক্যাথিটার ঢোকাতে বা স্বাভাবিক
ভাবে প্রস্রাব হতে হলে আরো অপারেশন লাগবে। কিন্তু বেলারুশের হাসাপাতাল থেকে আমাদের বিদেশে
যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে বিদেশ নিতে হলে লাখ লাখ ডলার
লাগবে। আর আমার স্বামী মাসে মাত্র ১২০ ডলার বেতন পায়। এক অধ্যাপক আমাদের শান্ত স্বরে
জানালেন, ‘তোমার মেয়ের যেসব সমস্যা আছে তা’ বিজ্ঞানের জন্য এক গভীর আগ্রহের বিষয় হতে
পারে। বিদেশের নানা হাসপাতালে চিঠি লেখো। তারা নিশ্চিত এ ব্যপারে আগ্রহী হবে।’ তা’
আমি এখন চিঠি লিখছি (শিশুটির মা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করেন)। আমি বিদেশে ডাক্তারদের
লিখি যে প্রতি আধা ঘন্টা অন্তর আমার মেয়ের শরীর থেকে আমরা মূত্র চিপে বার করি। ডাক্তাররা
ওর শরীরে যে কৃত্রিম প্রস্রাবের দ্বার তৈরি করে দিয়েছেন, সেখান থেকে আমরা প্রতিদিন
ওর মূত্র চিপে বার করি- আধা ঘন্টা অন্তর। গোটা পৃথিবীতে এমন একটা শিশুও কি আর আছে?
আর কতদিন এমন চলবে? একটি শিশুর দেহে তাকে সুস্থ করার জন্য নিয়মিত রেডিওথেরাপি দেবার
ফলাফল (ছোট পরিমাপে হলেও) কি? আমার মেয়েটাকে তোমরা বিদেশী ডাক্তাররা বরং নিয়ে নাও-
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হলেও নাও। আমি চাই না ও মারা যাক। ও ল্যাবরেটরির ব্যাঙ বা খরগোশ
হলেও আমার আপত্তি নেই, অন্তত: ও বাঁচুক (কান্না)। আমি ডজন ডজন চিঠি লিখেছি বিভিন্ন
দেশের ডাক্তারদের কাছে। হে ঈশ্বর!
আমাদের মেয়েটা এখনো সব কিছু বোঝে না। তবে একদিন ও নিশ্চিত আমাদের
জিজ্ঞাসা করবে: সে কেন অন্যদের মত নয়? সে কেন কোন পুরুষকে ভালবাসতে পারবে না? পাখিদের
কি হয়? সবার জীবন একরকম হলেও তার কেন অন্যরকম? আমি চেয়েছিলাম- আমার এটা প্রমাণ করার
মতো সক্ষম হতে হবে- যেন আমি হাতে সব কাগজ-পত্র পাই- যাতে সে জানতে পারে- বড় হলে সে
যেন জানতে পারে যে ও যে এমনটা হয়ে জন্মেছে তার দোষ বা দায় আমাদের নয়- তার বাবা-মা’র
ভালবাসার দোষ এটা নয় (আবার কান্না দমনের চেষ্টা)। আমি চার বছর হয় লড়াই করেছি- ডাক্তারদের
সাথে, আমলাদের সাথে- গুরুত্বপূর্ণ সব মানুষের দরজায় আমি করাঘাত করেছি। ডাক্তারদের কাছ
থেকে চারবছর পরে চেরনোবিল ও পার্শ্ববর্তী সব এলাকায় বাতাসের আয়নমন্ডলে তেজষ্ক্রিয়তার
প্রভাবের সাথে আমার মেয়ের এমনটি হয়ে জন্মানোর কারণটি স্বীকার করে এক টুকরো কাগজ পাওয়া
গেলো। চারবছর তারা আমাকে ঘুরিয়েছে। আমাকে বারবার তারা বলেছে: ‘তোমার মেয়ে জন্মগত প্রতিবন্ধকতার
রোগী।’ জন্মগত প্রতিবন্ধকতা মানে? আমার মেয়ে চেরনোবিল দূর্ঘটনার শিকার। ইত্যবসরে আমি
আমার পরিবারের গোটা বংশলতিকা পড়লাম- জন্মগত প্রতিবন্ধকতা কখনো আমাদের পরিবারে অতীতে
ঘটে নি। সবাই বলতে গেলে আশি-নব্বই বছর পর্যন্ত হেসে-খেলে বেঁচেছে। আমার দাদু বেঁচেছিলেন
চুরানব্বই বছর বয়স অবধি। ডাক্তাররা আমাকে পরে বলেছিলেন, ‘আসলে আমাদের উপর উর্দ্ধতনদের
নির্দেশ আছে যে এমন সব ঘটনাকে সাধারণ অসুস্থতা বলতে হবে। বিশ বা ত্রিশ বছর পর চেরনোবিল
বিষয়ে আমাদের ডাটা বেজ তৈরির কাজ যখন সম্পূর্ণ হয়ে যাবে, তখন আমরা আয়ন মন্ডলে তেজষ্ক্রিয়তার
কারণে ক্ষতিগ্রস্থ সবার সাথে যোগাযোগ শুরু করবো। তবে এই মূহুর্তে বিজ্ঞান এই বিষয়ে
খুব বেশি কিছু জানে না।” কিন্তু
আমার পক্ষে বিশ বা ত্রিশ
বছর অপেক্ষা করা বেশ কঠিন। আমি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাই। সরকারের বিরুদ্ধে
মামলা করতে চাই। ওরা সবাই আমাকে পাগল বলেছে, আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে। যেন বা আমি এক
শিশু যেমন শিশু প্রাচীন গ্রিসেও ছিল। এক আমলা আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলেন, ‘তুমি
আসলে চেরনোবিল সুবিধা চাও! চেরনোবিলের ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য গঠিত তহবিল থেকে টাকা চাও!’
আমি জানি না একথা শোনার পর কিভাবে আমি তার অফিসের ভেতরেই অপমান বোধে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম।
কোনদিনই সেটা জানব না।
একটা জিনিষ তারা অবশ্য বোঝে নি- তারা বুঝতে চায়ও নি- আমার যা
জানার দরকার ছিল তা’ হলো আমার মেয়ের এত কষ্টের পিছনে তার বাবা-মা’র প্রেমের কোন দোষ
নেই (ভেঙ্গে পড়ে কান্না)। আমার মেয়েটা বড় হচ্ছে- ও এখনো খুকী- তার নামটা তুমি ছেপো
না- চাই না পড়শিরা এমনকি আমার এ্যাপার্টমেন্টের অন্য তলার মানুষেরা ওর নাম জানুক। বড়
হলে ওকে আমি একটি সুন্দর জামা পরিয়ে মাথায় একটি স্কার্ফ পরাবো। লোকে বলবে, ‘তোমার কাতিয়া
দেখতে কত সুন্দরী!’ আর এদিকে সব গর্ভবতী নারীর দিকে আমি খুবই বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকাই।
আমি তাদের দিকে ঠিক তাকাই না। একটি দ্রুত, ঝটপট দৃষ্টি দিয়ে আবার চাহনী ফিরিয়ে নিই।
মনে এক মিশ্র অনুভূতি হয় তখন: বিষ্ময় এবং আতঙ্ক, ঈর্ষা ও আনন্দ আর এমনকি প্রতিশোধ স্পৃহা।
একদিন আমি নিজেই বুঝলাম যে এক অসুস্থ শিশুর জন্মদাত্রী হীনন্মন্য মা হিসেবে এই ক্রোধ,
ঈর্ষা আর প্রতিশোধের চোখে আমি আমার পড়শির গর্ভবতী কুকুরটি বা খড়ের বাসায় দুলতে থাকা
ডিমের ভারে গর্ভিনী পক্ষিণীর দিকেও একই চোখে তাকাই...
আমার মেয়েটা...
(লারিসা জে, মা)।


No comments:
Post a Comment