অঙ্কের দিদিমণি
( ৪ )
পুকুরঘাটের কিনারায় বসেছিল দেবপ্রসাদ।
মাথার ওপর রঙিন ছাতা। ইঁটের উনুনে রান্না হচ্ছিল মাংস। কত বাচ্চা লুকোচুরি খেলছে,
উড়ে যাচ্ছে এ ডাল থেকে ও ডাল। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, দূরে আকাশের তোরণ বানিয়েছে
রামধনু। বাতাসে বরফের গন্ধ। একে শীত, তায় হঠাৎ বৃষ্টি। ডাক্তার আর দেবু ভদকার
গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে দেখছিল হাওয়ায় কাঞ্চনের জোড়া পাতা কেমন প্রজাপতির মতো ডানা
নাড়ে। প্রীতি একটা বড় পদ্মপাতায় কষা মেটে নিয়ে আসে, ‘খালি পেটে মদ খেয়ো না, লিভার
যাবে’। প্রীতিকে অবাক ক’রে মাংসের ডেচকি থেকে ছিটকে বাইরে পড়ে চারামাছ। তখন পুকুরময়
মাছ, কে যে জল ঢেলেছিল না দেখে। কত অবাক কাণ্ডই না ঘটে! লুডো খেলার ফাঁকে প্রীতি
উঠে উনুনে শুকনো কাঠ গুঁজে দেয়, ‘আর পনের মিনিটের মধ্যে খাবার দিয়ে দেব। আগে
বাচ্চারা’। আজ বড়দিন, আজ প্রীতির জন্মদিন। কী দেওয়া যায় প্রীতিকে? বড় চকোলেট আর
রঙিন টিভি দিলে হয়। মেয়েকে কোলে নিয়ে চকোলেট খেতে খেতে সোফায় বসে সিনেমা দেখবে বড়-
এরকম কত স্বপ্ন দেবপ্রসাদ আজকাল দেখে। ঠিক স্বপ্ন নয়, চোখ খুলেও দেখে। আধোঘুমে দেখে, আধো জাগরণে দেখে। সব স্বপ্ন এত
মনোরম হয় না, দুঃস্বপ্নই বেশি। ঘুম আর জাগরণের ভেদরেখা আর তার নেই। মদ খাওয়া নিয়ে
প্রীতি আপত্তি করেনি ঠিকই, কিন্তু মেটে চচ্চড়ি কখনও দেয়নি। কেন না, কোনো সিনেমায়
নায়কের মেটে খাওয়া দেখায়নি। রেল লাইনের পাশের ডোবাগুলোয় শালুক আর পদ্ম ফুটে থাকতে
দেখেছে সে, কিন্তু, পদ্মপাতায় সে কখনও খায়নি। তবু দিনরাত দেবপ্রসাদ কিছু না কিছু
দেখে। প্রীতি বেঁচে থাকতে এ সবের অর্ধেক দেখলেও বিজ্ঞাপন করার মতো সুখী পরিবারের
কর্তা হতে পারত সে। ডাক্তার বলে, ‘এবয়সে এসব স্বাভাবিক। পেট ভরা উইন্ড, মন জোড়া
ডিপ্রেশন, চোখময় অনিদ্রা আর অ্যাকাউন্ট ভর্তি টাকা নিয়ে মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে
যায়। মৃত্যুকে আটকানোর পদ্ধতি হিসেবে না পাওয়া জিনিসগুলো, না করা কাজগুলো স্বপ্নে
ফিরে আসে। ঘুমটাই শুধু ফেরে না ’।
- ডাক্তার, তুমি আর ডাক্তার নেই, দার্শনিক
হয়ে উঠছ, লোকাল বাবাগোছের হয়ে প্রবচনও দিতে পারো, দেবু ফোড়ন কাটে।
- হবে হয়ত,কিন্তু মানুষ যত মৃত্যুর দিকে
এগোয় তত পুরনো কথা ফিরে আসে। মূল্যহীন কথাগুলো হঠাৎ আনন্দের একমাত্র উৎস হয়ে পড়ে।
আমারও হচ্ছে। হয়তো আমিও মৃত্যুর...চুপ করে যায় চাঁদু।
সন্ধ্যের পর হুইস্কি খাওয়া দুজনের
অনেক দিনের অভ্যেস। গুনেগুনে তিন পেগ। ঠিক আটটায় শুরু। সাড়ে নটায় শেষ। বেশির ভাগ
সময় একা একাই খেত দুই বন্ধু। যে যার বাড়িতে। কালেভদ্রে একসঙ্গে। ডাক্তারের চেম্বার
শেষ হ’লে। ইদানিং রোজ একসঙ্গে বসা হচ্ছে। ষাটের পর দুজনের বন্ধুত্ব বেড়ে গেল। এই
সময় রুগীদের থেকে মন চলে গেল ডাক্তারের।
অন্য সামাজিক যোগাযোগও কমে এল। তার মধ্যে যে পরিবর্তনটা হ’ল তা ভৌত,
রাসায়নিক এবং সব মিলিয়ে কিছুটা আধ্যাত্মিকও। যদিও তার ধারণা, এখন সুস্থতার দিকে
যাচ্ছে। এদিকে অনেকদিন প্রেশার, কোলেস্টরেল, থাইরয়েড এবং ডিপ্রেশনের ওষুধ বদলাতে
বদলাতে দেবপ্রসাদ ততদিনে একজন অর্ধশিক্ষিত ডাক্তারে পরিণত হয়েছে। পুরনো রুগীরা আক্চার
যেরকম হয়। ডাক্তারের রুগী হওয়া আর রুগীর ডাক্তার হওয়ার প্রক্রিয়া দুজনকে
মানসিকভাবে এক স্তরে এনে ফেলেছে। এখন, আটটার পর, সুস্মিতার টোল বন্ধ হ’লে শসা আর
টমেটোর কুচি দিয়ে দুজনে মদ খায়। কোনোদিন কথা হয়, কোনোদিন হয় না। একদিন তিন পেগের
পর ডাক্তার বলে, ‘স্নেহ-ভালবাসা না হয় দিতে পারলে না, বাপ হয়ে মেয়ের সম্বন্ধগুলো
কাঠি ক’রলে কেন বলো তো ? কোনো ভদ্রলোক এরকম করে?’
- কী জানো ভাই, মেয়েটা চলে যাবে, অন্য
পুরুষের কাছ থেকে ভালবাসা পাবে ভাবলেই কেমন বুকটা ফাঁকা-ফাঁকা লাগত। অত সুন্দর
পরীর মত মেয়েটাকে কোথাকার কোন অচেনা ছেলে খুশি করবে ভাবলে নিজেকে অপদার্থ মনে হ’ত।
একা একা কীভাবে যে থাকব!
- তুমি মানসিক রোগগ্রস্ত। ওভাবে একাকীত্ব
কাটে? কেটেছে? উল্টে মেয়েটার সর্বনাশ হল, একদম হাতের বাইরে চলে গেল। মেয়ে অন্য
পুরুষের, অন্য পুরুষও মেয়ের। তার মাঝে তুমি কে হে।
- বটেই তো। আমি একটু অদ্ভুত, মানছি। কিন্তু
সব মানুষই কি অদ্ভুত নয়? আচ্ছা যদি কাল সকাল থেকেই চেষ্টা করি, এখনও তো বিয়ের বয়স
চলে যায়নি, হবে না? ঐ যে বলে না, যখন জাগবে তখনই সকাল।
- না হে, হবে না। এত রাতে জেগে উঠলে সকাল
পালিয়ে যায়। তুমি একবগগা মাথাভারী ঘুড়ির মতো, সর্বদা মাটির দিকে গোত্তা মারো। কিছু
মানুষ ট্রেন চলে যাওয়ার পর স্টেশনে পৌঁছে হাঁকপাক করে, তুমি সেরকম। ট্রেনের
ক্ষেত্রে তারপরও একটা পার্সেন্ট রিটার্ন পাওয়া যায়, লাইফে হয় না।
একমত হওয়ার জন্য
দুজনের মতবিরোধ চলতে থাকে। এটা ওদের মদ্যপানের প্রধান সঙ্গী, তা উস্কে দেওয়ার জন্য
কিছু না কিছু। উপকরণ এসে যায়। যেমন ট্রেনের কথায় এল ট্রেন। জোর হুইসেল বাজিয়ে।
গুমগুম ক’রে বাড়ি কাঁপিয়ে পেছন দিয়ে চলে যাওয়া শুনল দুজনে। দূরের গাড়ি। মদ খেলে
দেবপ্রসাদের অনুতাপ না হ’লেও রসবোধ বাড়ে। সে বলে, ‘আচ্ছা ডাক্তার, ট্রেনের কথায়
ট্রেন এল, বিয়ের কথায় পাত্র আসবে না কেন’ ?
-
হয়তো আসবে, কিংবা আসবে না; এলেই বা কী,
ট্রেনের মতো সে-ও বাঁশি শুনিয়ে চলে যাবে।
বয়স বাড়লে
স্মৃতিচারণের ঝোঁক বাড়ে, এটা বিপজ্জনক রোগ। যে অসুখে মানুষ মনে করে সে একটা
ঘটনাবহুল জীবন কাটাতে পেরেছে। দুই বন্ধুর স্মৃতিকাতরতা নেই, তাই বিশেষ বিষয়ও নেই।
না পরনিন্দা, না শেয়ার মার্কেট, না যৌন-অতৃপ্তি, না
মার্কেজ-কুন্দেরা-দেরিদা-চমস্কি। নেই জিডিপি, নেই চাইল্ড লেবার, নেই জেনেরিক
মেডিসিন, নেই ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। রিসেশান নেই, পরস্ত্রী নেই, ওবামা-ইরান নেই,
এমনকি সংবাদপত্রও নেই। শুধু আছে এই শসা-টমেটো-হুইস্কি। ফুরিয়ে গেলে রিপিটেশন। কোটা ফুরোলে যে যার
কোটরে ফিরে যায়। বিষয়হীন বন্ধুত্বে কীভাবে যেন দুজনের নির্ভরতা বেড়ে গেছে। শব্দে
আর কত সম্পর্ক হয়। দুই বন্ধুর আজ নেশা খুব। নিয়ম ভেঙে অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি
খেয়ে ফেলেছে। দেবপ্রসাদ ছোট হ’য়ে আসা চোখে বরফজল দেয়। পুরনো সেই প্রশ্নটা তাকে
আবার জ্বালাচ্ছে, কথাটা পেরেই ফেলে সে- কিছু যদি মনে না করো তো একটা কথা...
-
ন্যাকামো না ক’রে বল, ভণিতা ভাল লাগে না।
-
সুস্মিতা কি সত্যিই আমার মেয়ে? তুমি
বিশ্বাস করো ?
- সেটা জরুরী? তিরিশ বছর আছ, এটা বেশি
জরুরি নয় কি? এত বছর পরে এসব কথা কেউ বলে ? বরং ভাবো আরও ভাল ক’রে কেন থাকোনি,
থাকা যায় কিনা।
- তা নয়, প্রীতি অন্য কারোর সঙ্গে শুয়েছিল
কিনা সে কথা বলিনি। সে নিয়ে কে ভাবে। আমার কেমন যেন আজকাল মনে হয়, ভাবলে বোধহয়
অনেক কিছু হয়। সঙ্গমের সময় যদি কেউ অন্যের কথা ভাবে তা হ’লে জিনের গঠনে পরিবর্তন
হতে পারে? কেমন সন্দেহ হয়। মনে হয় ডাক্তাররা ফালতু কথা বলে।
- সে সন্দেহ আমারও হয়। এত বছর বিজ্ঞান ছাড়া
কিছু ভাবিনি, তবু এখন মনে হয় যুক্তির বাইরে বহু কিছু হয়। মনের যে কী ক্ষমতা আমরা
বুঝিনি। যারা বোঝে তাদেরও বুঝিনি। এটা একা একা বুঝতে হয়। সে কারণেই হয়তো এড়িয়ে
চলেছি। আমরা দল বেঁধে একা থাকি, একা একা দল হই না। কী জানি কিসে কী হয়!
-
তার মানে তুমি বলছ ভাবলেই সন্তান হয় ?
কল্পনার জিন থেকে পরী হয় ?
-
হয়তো। পুরাণে তো হ’ত। ঠিকভাবে ভাবলে কি
না হয়, পৃথিবীটাই মনের মতো হয়ে যায়। আন্তরিকভাবে বৃষ্টির কথা ভাবো, দেখবে বৃষ্টি
এসে যাবে। ডাক্তার শসার টুকরোয় নুন লাগায় আনমনে।
-
তারমানে দেবানন্দ কিংবা রাজেশ সত্যিই
সুস্মিতার বাবা হ’তে পারে? দেবপ্রসাদের ওয়ান পয়েন্ট অ্যাজেন্ডা।
-
হ’লেই বা কী। চোখের সামনে ফুটফুটে একটা
বাচ্চা তিরিশ পেরিয়ে গেল, তাকে নজরে পড়ল না ? মনে ধরল না ? তুমি বাপ, সুস্মিতা
মেয়ে- এই সহজ কথাটা বুঝতে অসুবিধা কোথায়। বাবা হওয়ার মত সরল কাজটা কি শুধু ঐ এগারো
মিনিটের শোয়াশুয়িতেই শেষ ? কেমন কিসিমের মানুষ তুমি ! দমবন্ধ পরিবেশটা তুমি এন্জয়
করো মনে হয়।
- বোধহয় করি।
- সঙ্গমের সময় কখনও অন্য মেয়ের কথা ভেবেছ
দেবু ? সবাই ভাবে। সেই যুক্তিতে প্রীতির অপরাধ কোথায় ?
- ভেবেছি। আমার ভাবনায় আশেপাশের মেয়ে ছিল।
এর মাসি, ওর পিসি, বন্ধুর বোন, কলেজের মেয়ে, স্কুলটিচার ছিল। সে বাচ্চা এরকম হ’ত
না। সব এলেবেলে মেয়ে। মধুবালা, নার্গিস, সুচিত্রা বা ওয়াহিদা কখনো আসেনি। তাই আমার
দায় নেই।
-
ছাড়ো তো ওসব কথা। বাকি ক’টা দিন আর
মেয়েটাকে জ্বালিও না। তোমার মন নরকের দিকে, ওকে আর টেনো না।
দেবপ্রসাদের বেশ নেশা হ’য়েছে। তার
মাথায় এসব ঢোকে না। ডাক্তার টলোমলো ক’রে ওঠে। সিঁড়ির রেলিং ধ’রে ধীরে ধীরে নামতে
থাকে। দেবু চায় সব সংশয়ের অবসান, ‘বি স্পেসিফিক ডাক্তার, দেবানন্দ না রাজেশ’।
ঘোলাটে চোখে অবাক হ’য়ে তাকায় ডাক্তার- কী মানুষ রে বাবা! সে নামতে থাকে, উত্তর দেয়
না। আবার একই প্রশ্ন আসে। ডাক্তার তখন দশ নম্বর ধাপে।
হেলতেদুলতে সে উত্তর দেয়, ‘দুজনের
কেউ নয়’।
-
তা হ’লে কে? দেবুর গলা অশ্রুভেজা।
-
দাদাসাহেব ফালকে। চাঁদুর স্বর উইংসের
আড়ালে মিলিয়ে যায়।
রাতে ঘুম হয়না দেবপ্রসাদের। এ
বয়সে ঘুম ক’মে আসে। সারাদিন যে শুয়েবসে কাটায় তার ঘুম আসবেই বা কেন। দেবপ্রসাদ ঘরে
খুটখাট করে। কীভাবে রাত কাটাবে সে বুঝতে পারে না। পশ্চিমের জানালা খুলে সে স্টেশন
দেখে। দেখে ঋতুভেদে তার চরিত্রের বদল। সিগন্যালের আভায় দেখে ধোঁয়া ও ধুলোর
পরিবর্তন। আলমারি খুলে পুরনো অ্যালবাম দেখে। ইন্সিওরেন্সের কাগজপত্র ঘাঁটে।
ছোটবেলার জীর্ণ হ’য়ে যাওয়া ছড়াছড়ির বই সে ফেলেনি, সেগুলো খোলে। দেখে একটা বইয়ের
মাঝে সিন্ডারেলা সেজে সুস্মিতা ব’সে ললিপপ খাচ্ছে। পাশে ব’সে নারকোল কুড়োচ্ছেন মা।
আর পেঁজা মেঘের মতো নারকোল কোড়া দিয়ে মুড়ি মেখে খাচ্ছেন বাবা। দেবপ্রসাদের মন
খারাপ লাগে। আলমারির নিচের তাকে চায় সে। বীমা কোম্পানি বছর বছর ডায়েরি পাঠিয়ে
গেছে। কোরা কাপড়ের মতো অব্যবহৃত রয়ে গেছে সব। সুস্মিতাকে দিয়ে দিলে হয়। অঙ্কের
সাজেশন লিখবে না হয় ব্যাচ ধ’রে ধ’রে। তারপর মনে হয় ডায়েরিগুলো তাকে ডাকছে-লিখেই
দেখো না, আমি এখনও অপেক্ষায় আছি। কোনদিন যা ভাবেনি, চিরকাল যা অপছন্দ ক’রেছে, আজ
মাঝরাতে নিশির ডাকের মত ভূতগ্রস্ত দেবপ্রসাদ সেই কাজ শুরু করে। বালিশ সরিয়ে
বিছানায় ডায়েরি খুলে বসে। সে-ও শেষপর্যন্ত ডায়েরি লেখা শুরু ক’রল। পরিবারের ধারা
বজায় রেখে। যথারীতি দিনলিপি নয়, আংশিক আত্মকথন। যেখানে সত্য ও মিথ্যা, বাস্তব ও
অবাস্তব একাকার। এবং, সবমিলিয়ে ব্যর্থতার এলোমেলো অজুহাতমালা। উৎসর্গপত্রের মতো
একটা পাতা ছেড়ে শুরু। সে পাতার মাঝে মহাপুরুষের বাণীর মতো সে লেখেঃ- জীবনের সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ কাজ আনন্দ খুঁজে পাওয়া। সবচেয়ে সহজ কাজও এটা। তবু মানুষ তা পারে না।
কারণ সহজ কাজ করা সবচেয়ে কঠিন। যখন একজন সেটা উপলব্ধি করে তখন তার সময় ফুরিয়ে আসে।
বাবা নিজের ঘোরে থাকতেন, আমার দিকে তাকাননি। স্ত্রী নিজের ঘোরে থাকত আমার দিকে
তাকায়নি। মেয়ে নিজের ঘোরে আছে, আমার দিকে তাকায় না। আমি আমার ঘোরে থেকেছি, কারও
দিকে তাকাইনি। সবচেয়ে দুঃখের হ’ল, কেউ নিজের দিকে আসলে চায় না। যেটুকু সময় আছে
চেষ্টা ক’রে দেখি।
চেষ্টা করার মতো সময় তার ছিল না।
তবু সম্ভাব্য বিষয়বস্তুর তালিকায় সে ভাবে- আমি, আমার বাবা, আমার মা, স্ত্রী, আমার
মেয়ে এবং ছেড়ে আসা জমি- এরকম ক’টা অধ্যায় লিখবে। আর অবশ্যই বড়সড় ক’রে লিখবে
‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস’। যে বিষয়টা তার একদম অজানা, যে তাকে আততায়ীর মতো
বিপন্ন করেছে, তার যৌবনকে বিভ্রান্ত ক’রেছে- সিনেমা আমাদের প্রভাবিত ক’রেছে, নাকি,
আমরা সিনেমাকে প্ররোচিত ক’রেছি জানি না। সবরকম গল্প নিয়ে ছবি হয়। তারপর সবাই
গল্পের মতো জীবন কাটায়। আমাদের পরিবারকে নিয়ে সিনেমা বানানো সহজ হবে না। তা সবার
জন্য হবে না। কেন না, আমরা আর্ট ফিল্মের জীবন কাটিয়ে গেলাম। সিনেমার শুরুটা এমন
ছিল না, অন্তত দাদাসাহেব ফালকে এভাবে ভাবেননি। মানুষ এতটা জড়িয়ে পড়বে বুঝতে
পারেননি।
দেবপ্রসাদ লিখেই চলল। প্রতি রাতে
কিছু সময়। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে। কখনও জানালার ধারে যায়। কখনও টেবিলে বসে। কখনও
বিছানায়। বাবার মতো ঘুরেঘুরে সে লিখে চলল। কিছুদিন সব গুলিয়ে গেল। জ্বরের ঘোরে,
দুঃস্বপ্নে খড়ের গাদায় ডুবতে ডুবতে পাঁকে তলিয়ে যাওয়ার মতো। অধারাবাহিক ও
পারম্পর্যহীন টালমটাল লেখায় ভরে গেল অনেকগুলো ডায়েরি। দেবপ্রসাদ লিখত আর তা লুকিয়ে
রাখত বন্ধ আলমারিতে। এই প্রক্রিয়া থামল মাঝারিমাপের সেরিব্রাল অ্যাটাক তাকে পেড়ে
ফেলায়। একেবারে থামাল না। জড়ানো জিভে পা টেনে চলা জবুথবু এক বৃদ্ধে পরিণত করল। যে
বাকি সময়টা পরবর্তী অ্যাটাকের আশঙ্কা ও অপেক্ষায় কাটাবে। আর, যখন তখন ছেলেমানুষের
মতো কেঁদে ফেলবে যে-কোনো ছুতোয়।
( ক্রমশ )
No comments:
Post a Comment